সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে ব্যাপক অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দলের একাংশের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে হামলা-মামলার শিকার হওয়া ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন অভিযোগ থাকা কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হয়েছে। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে বলে দাবি তাদের। গত ২৭ জুলাই বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে আলহাজ সোলাইমান কবীরকে আহ্বায়ক এবং অ্যাডভোকেট এস এম আশেক এলাহী মুন্নাকে সদস্য সচিব করে শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা ও একাধিক মামলার মুখেও যারা বিএনপির রাজনীতি ধরে রেখেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকেছেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, তাদের অনেকেই নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। অন্যদিকে, অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন অভিযোগ থাকা কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে গাজী শাহ আলমের অন্তর্ভুক্তি। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে প্রভাব খাটিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সে সময় তার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়নি; বরং জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গাজী শাহ আলম আওয়ামী লীগের পরিচয় ত্যাগ করে নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে সাতক্ষীরা জেলা জাসাসের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হলেও জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে শ্যামনগর উপজেলার ৫ নং কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর বাজারে তিনটি দোকানে লুটপাটের ঘটনায়ও গাজী শাহ আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী কওছার আলী গাজীর দাবি, তিনি গাজী শাহ আলম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে তৎকালীন দায়িত্বরত অফিসার ইনচার্জ অভিযোগ গ্রহণ করেননি। পরে তিনি সাতক্ষীরা সেনা ক্যাম্পের অধিনায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তবে অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান তিনি।স্থানীয়দের একাংশের দাবি, গাজী শাহ আলমের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে, যার সদস্যরা তার নির্দেশনায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট, সীমান্তপথে অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এসব অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন নথি, ছবি ও অভিযোগপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, অতীতে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণকারী এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিতে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া দলের আদর্শিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিরুৎসাহিত করবে এবং ভবিষ্যতে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা আরও জানান, গাজী শাহ আলম পূর্বে জেলা জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক হলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আবার উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্ত করায় তারা বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মীর মতে, নতুন কমিটি পুনর্বিবেচনা করে অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক অবদান, ত্যাগ ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত বিতর্কিত ও অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে কমিটি পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
এবিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) আলহাজ্ব মোঃ অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।