মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

শেষ চিরকুটে স্তব্ধ মরিয়ম

মোহাম্মদ মুজাহিদঃ / ২১ Time View
Update : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কিছু মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়, কিছু মৃত্যু মানুষকে ভাবায়। আবার কিছু মৃত্যু এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সমাজের আয়নায় নিজেদেরও একবার দেখে নিতে হয়। রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ১৯ বছরের মরিয়ম খাতুনের নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনা তেমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত এই তরুণীর মৃত্যু এরই মধ্যে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মরিয়মের কক্ষ থেকে একাধিক হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব লেখায় ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক যন্ত্রণার কথা উঠে আসার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একজন ১৯ বছরের তরুণী কী এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন, যার শেষ প্রান্তে গিয়ে তাঁর জীবন থেমে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো একটি চিরকুটে নেই। হয়তো আছে বহু দিনের জমে থাকা অভিমান, না-বলা কথা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব কিংবা এমন কোনো বাস্তবতায় যা এখনো পুরোপুরি আমাদের সামনে আসেনি।

মৃত্যুর আগে মানুষ কী লিখে যায়, সেটি কখনো কখনো তাঁর ভেতরের অদৃশ্য পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। কিন্তু একটি চিরকুটকে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক। কারণ একটি লেখা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের আবেগ। তার পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের ঘটনা। থাকতে পারে এমন কিছু সম্পর্ক, কথোপকথন কিংবা পরিস্থিতি, যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। মরিয়মের চিরকুট নিয়ে মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চিরকুটের প্রতিটি শব্দের সত্যতা যাচাই করা, হাতের লেখা ফরেনসিকভাবে পরীক্ষা করা, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করা।কারণ মরিয়ম এখন কথা বলতে পারবেন না। তাঁর হয়ে কথা বলবে তাঁর লেখা, তদন্তের আলামত এবং সত্য উদঘাটনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। মরিয়মের লেখা বলে যেসব কথা গণমাধ্যমে এসেছে, সেখানে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি অভিমান ও কষ্টের কথাও আলোচনায় এসেছে। ভালোবাসার সম্পর্ক যখন একজন মানুষের কাছে আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন সেই সম্পর্কেই যদি কোনো কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তার অভিঘাতও গভীর হতে পারে। কিন্তু এখানে আবেগের চেয়েও বড় প্রশ্ন কী ঘটেছিল?সম্পর্কের ভেতরে কি কোনো বিরোধ ছিল? মরিয়ম কি কোনো ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন? তিনি কি কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন? মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন? ঘটনার আগে তাঁর আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলেন কি কেউ?চিরকুটগুলো কখন, কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া একটি তরুণীর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।

গাজী নজরুল ইসলাম একজন সংসদ সদস্য। ফলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনআলোচনায় আসবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের পথে প্রভাব না ফেলে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা করাও সমানভাবে অনুচিত। আইনের চোখে প্রত্যেকেই জবাবদিহির আওতায়। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা সেটি নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদ শিরোনাম নয়।ইতোমধ্যে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে মামলায় ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই তার সত্যতা নির্ধারিত হবে। মরিয়মের বয়স মাত্র ১৯ এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবায়। মাত্র ১৯ বছর বয়স। এই বয়সে একজন তরুণীর সামনে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পড়াশোনা, পরিবার, ভালোবাসা, নিজের পরিচয় তৈরি করা, জীবনের কত কিছুই তো তখনো বাকি থাকে। কিন্তু মরিয়মের জীবনের সেই সম্ভাবনাগুলো আজ থেমে গেছে। তাঁর মৃত্যু নিয়ে আমরা হয়তো কয়েক দিন আলোচনা করব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হবে। নানা মত, নানা মন্তব্য, নানা ব্যাখ্যা আসবে। তারপর হয়তো নতুন কোনো ঘটনা এসে এই ঘটনাটিকে আড়াল করে দেবে। কিন্তু একটি পরিবারে শোক থেকে যাবে। একজন মায়ের বুক খালি থাকবে। একজন বাবার চোখে প্রশ্ন থাকবে। স্বজনদের মনে থেকে যাবে কেন? এই কেন এর উত্তরই সবচেয়ে জরুরি। শেষ চিরকুট কি সত্যিই শেষ কথা? মরিয়মের ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও ভালোবাসার কথা, কোথাও অভিমান, কোথাও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। চিরকুটের বক্তব্যের ব্যাখ্যা আর মৃত্যুর আইনি কারণ এক বিষয় নয়। চিরকুটে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্তের সূত্র হতে পারে। নিজে থেকেই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।আবার চিরকুটে কোনো ব্যক্তির নাম না থাকলেও সেটি তদন্তের বাইরে রাখা যায় না। তাই চিরকুটকে কেন্দ্র করে আবেগ নয় প্রমাণের ভিত্তিতে এগোতে হবে। মরিয়মের মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্যও একটি আয়না। আমরা কি আমাদের প্রিয় মানুষটির নীরব কষ্ট বুঝতে পারি? একজন মানুষ যখন বারবার বলে আমি ভালো নেই, তখন আমরা কি সত্যিই শুনি? কেউ যখন অভিমান করে দূরে সরে যায়, তখন আমরা কি তাকে সময় দিই? কেউ যখন সম্পর্কের ভেতরে নিজেকে একা মনে করে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ কি থাকে?নাকি আমরা তখনও ভাবি এগুলো পারিবারিক ব্যাপার, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে? অনেক সময় মানুষ মৃত্যুর আগে সরাসরি সাহায্য চায় না। তার আচরণ, কথাবার্তা, লেখা কিংবা নীরবতার মধ্যেই হয়তো সংকেত থাকে।

সেই সংকেতগুলো বুঝতে না পারার দায় শুধু একটি পরিবারের নয় সমাজেরও। মরিয়মের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য, অভিযোগ ও ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কাউকে দায়ী করছেন, কেউ আবার পুরো ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন।কিন্তু আমরা যদি সত্যিই মরিয়মের প্রতি ন্যায়বিচার চাই, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তথ্য ও অনুমানকে আলাদা করা। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তে আসুক। আলামত থাকলে তা পরীক্ষা করা হোক। চিরকুট থাকলে তার ফরেনসিক পরীক্ষা হোক। সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা দেখা হোক। কললিস্ট ও যোগাযোগের তথ্য প্রয়োজন হলে যাচাই করা হোক। ঘটনার আগে ও পরে কারা কোথায় ছিলেন তা তদন্তে স্পষ্ট হোক। পরিবার, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হোক। এবং সবশেষে যে সত্য বেরিয়ে আসে, সেটিই সামনে আসুক। আমাদের দেশে অনেক মৃত্যু সময়ের সঙ্গে সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি গল্প থাকে। মরিয়মের গল্পও হয়তো কোনো একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি হতে পারে সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য, ভালোবাসার নামে প্রত্যাশা, মানসিক চাপ, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক জটিলতা এবং তরুণ প্রজন্মের একাকিত্ব নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ।

তবে এসব বিশ্লেষণের আগে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি মরিয়মের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? শেষ কথা মরিয়ম আজ নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুটগুলো যেন নীরবে প্রশ্ন করছে আমার সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো রাজনৈতিক স্লোগানে নেই। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও নেই। কারও ব্যক্তিগত ধারণাতেও নেই। উত্তর আছে তদন্তে। উত্তর আছে প্রমাণে। উত্তর আছে সত্য উদঘাটনে। মরিয়মের মৃত্যু নিয়ে কারও বিরুদ্ধে আগেভাগে রায় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে সত্য চাপা পড়ুক সেটিও কাম্য নয়। একজন ১৯ বছরের তরুণীর মৃত্যুর সত্য জানতে চাওয়া কোনো পক্ষ নেওয়া নয় এটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক দাবি। শেষ চিরকুটে যদি মরিয়মের কোনো আর্তনাদ থেকে থাকে, সেই আর্তনাদ যেন তদন্তের টেবিলে হারিয়ে না যায়। মরিয়ম আর কথা বলতে পারবেন না এখন তাঁর হয়ে কথা বলুক সত্য।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com