শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫০ পূর্বাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

১৫ বছরেও বঞ্চিত পুলিশের ৩০তম বিসিএস

মোহাম্মদ মুজাহিদ: / ৯৮ Time View
Update : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ সেই বাহিনীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনায় যদি দীর্ঘসূত্রতা, বৈষম্য কিংবা বঞ্চনার অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হতাশার নয় বরং এটি পুরো বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও মনোবলের সঙ্গেও সম্পর্কিত।বাংলাদেশ পুলিশের ৩০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। ২০১২ সালের ৩ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ৩০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা। দেখতে দেখতে তাদের চাকরির মেয়াদ ১৫ বছরে পৌঁছেছে। বর্তমানে এ ব্যাচে প্রায় ১৭৯ জন কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কিন্তু দীর্ঘ এই কর্মজীবন পার করেও তাদের অধিকাংশ এখনও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত যা তাদের মধ্যে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। একসময় বাংলাদেশ পুলিশে একজন কর্মকর্তার চাকরিজীবনের ৭-৮ বছরের মধ্যেই পুলিশ সুপার হওয়ার নজির ছিল। কোনো কর্মকর্তা বিভাগীয় জটিলতা কিংবা নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি না পেলেও পরবর্তী সময়ে ৯-১০ বছরের মধ্যে পদোন্নতির সুযোগ পেয়েছেন এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। সেই বাস্তবতায় ১৫ বছরেও ৩০তম বিসিএসের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তার পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি না হওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির সঙ্গে তুলনা করলেও বৈষম্যের অভিযোগটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের দাবি। প্রশাসনের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে উপসচিব হয়েছেন এবং ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও শিগগিরই উপসচিব পদে পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে। একই সময়ে অন্যান্য ক্যাডারের ৩৩/৩৪ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অনেকেই জেলার গণপূর্ত ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়।

বর্তমানে অধিকাংশ জেলা প্রশাসক ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অদূর ভবিষ্যতে ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদেরও জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ একই বিসিএস ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তারা এখনও পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকবেন এটি নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়। আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের ২৮ ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ প্রায় তিন বছর আগে সুপারনিউমারারি পদে পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে একই বাহিনীতে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির ধারাবাহিকতা ও সময়ের ব্যবধান নিয়ে ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।অবশ্যই পদোন্নতি কোনো কর্মকর্তার স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, শৃঙ্খলা, গোপনীয় প্রতিবেদন, শূন্যপদসহ রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে কিংবা একই পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক বৈষম্য তৈরি হয়, তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠবেই।

৩০তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের অধিকাংশই দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অনেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও অংশ নিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে অবদান রেখেছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে দীর্ঘ ১৫ বছর চাকরি করার পরও কেন তাদের পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে? আর কতদিন তারা ফাইলের পেছনে ছুটবেন? একজন কর্মকর্তা যদি বছরের পর বছর একই পদে থেকে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী পরবর্তী দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পান, তাহলে তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি বাহিনীর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হলে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের ওপরও পড়তে পারে। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় অতীতের পদোন্নতি বা বঞ্চনার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তার পদোন্নতি যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা তদবিরের ওপর নির্ভর না করে এটাই একটি পেশাদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা।

একইভাবে অতীতে যারা কোনো কারণে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বিষয়টিও নিরপেক্ষ ও নীতিনির্ভর প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র সচিবালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের নেতৃত্ব বিষয়টি দ্রুত বিবেচনায় নেবে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি আটকে থাকার কারণ নির্ধারণ করে যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হবে এটাই এখন তাদের প্রত্যাশা। প্রয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, বিভাগ, দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাঠামোয় অতিরিক্ত পদ সৃজন করে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-জটিলতা কমবে, অন্যদিকে রাষ্ট্র তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে। একটি বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, ইউনিফর্ম কিংবা সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। বাহিনীর সদস্যদের ন্যায়সংগত মূল্যায়ন, পেশাগত মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়েও তাদের আস্থা থাকতে হয়। তাই ৩০তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়টি কেবল একটি ব্যাচের দাবি হিসেবে না দেখে পুলিশের সামগ্রিক পেশাগত কাঠামো ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। ১৫ বছর একটি কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়।

এই দীর্ঘ সময়ে একজন কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, নেতৃত্ব দেন, ঝুঁকি নেন এবং রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা বৃদ্ধি করবে না, বরং বাংলাদেশ পুলিশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকেও আরও শক্তিশালী করবে। তাই এখন সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কার্যকরভাবে ভাবার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রশাসনিক, আইনগত বা কাঠামোগত জটিলতা থাকে, তা দ্রুত নিরসন করা হোক। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ৩০তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হোক।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com