ভোরের আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাঁদের দিন শুরু হয়, সাইকেলে বিভিন্ন দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে দেশ-বিদেশের খবর নিয়ে যাঁরা অন্যের দ্বারপ্রান্তে হাজির হন, দুই পয়সা আয় করে অন্ন মুখে দিতে পারলেই যাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন উপভোগ করে বাঁচেন, বলছি তাঁদেরই কথা, পত্রিকার হকারদের কথা।
কাকডাকা ভোরে তাঁদের পত্রিকা নিয়ে ছুটতে হয় গ্রাহকের দুয়ারে। ঝড়, বৃষ্টি, গরম কিংবা শীত উপেক্ষা করে নিজেদের দায়িত্বকে বড় করে দেখে সংবাদ পৌঁছে দিলেও তাঁদের খবর কজনই-বা রাখে? অথচ দেশ-বিদেশের খবর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলেও তাঁরা রয়ে যান খবরের অন্তরালে।
কোনোমতে জীবন চলে সংবাদপত্র হকারদের। সংসারের চাকাটা সচল রাখতেই ছুটে যান দূরদূরান্তে। কতশত দুর্দিনের সাক্ষী হতে হয় তাঁদের, এ খবর কেউ রাখে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে থাকলেও তাঁদের খোঁজখবর নেওয়ার কেউ থাকে না, বরং খবরের কাগজটা ঠিক সময়ে পৌঁছাতে না পারলেই খেতে হয় ধমক।
হকাররাও মানুষ, রক্তমাংসে গড়া তাঁদের দেহ। অথচ পা ক্ষয় করে গলা ফাটিয়ে বেড়ান শুধু একটা পত্রিকা বিক্রির জন্য। ভোরের আলো ফোটার পর থেকে সারা দিনের পরিশ্রমের ফল আসে সর্বসাকল্যে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। কিন্তু এই আয়ের কোনো নিরাপত্তা নেই। এমনকি সামান্য এই আয়ের নিমিত্তে বিপন্ন হয় পুরো জীবন।
এ জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে দিতে হয় নানা দৌড়ঝাঁপ, যাতে দুর্ঘটনায় পড়াই স্বাভাবিক। অথচ পাঠকের কাছে নিজের জীবন বাজি রেখে খবরের কাগজ পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু দুর্ঘটনায় তাঁদের পাশে থাকার কেউ নেই।
হকারদের পরিবার-পরিজন আছে। সন্তান লালন-পালন করে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ এই আয় দিয়ে টিকে থাকা যেখানে মুশকিল, সেখানে এই কাজ করে ধনী হওয়া তাঁদের কাছে যেন অভাবনীয় কল্পনা। তাঁরা শুধু বাঁচতে চান, চান দুমুঠো অন্ন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আয়–ব্যয়ের পাল্লায় সার্বিকভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া কোনো কোনো পত্রিকার ক্ষেত্রে অবিক্রীত পত্রিকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁরা বেশ দুশ্চিন্তায় থাকেন।
কিন্তু কজনই–বা তাঁদের খবর রাখে? তাঁদের নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কারও চিন্তা কিংবা মাথাব্যথা আছে কি না, প্রশ্ন থেকেই যায়। তাঁদের কথা ভাবুন, যাঁরা দেশ-বিদেশ কিংবা সবদিকের খবরে আমাদের ভাবাতে শেখান। আমাদের উচিত পত্রিকার হকারদের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া, যাঁদের অঢেল ও সীমাহীন পরিশ্রমের ফলে আমরা প্রতিদিন সংবাদপত্র পাই এবং পড়ি।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন দেশের লেখক–সাহিত্যিকেরা, যাঁদের কলমের খোঁচায় উঠে আসবে হকারদের দুর্ভোগের কথা। হয়তো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসায় থাকার স্বপ্ন তাঁরা দেখেন না, তবে একটু ভালো করে বাঁচতে চান, বাঁচতে চান তিন বেলা ডাল–ভাত খেয়ে।