সাতক্ষীরা জেলা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স অফিস এখন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্যের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, এলপিসি কিংবা উন্নয়ন ও ঠিকাদারি বিল টাকা না দিলে আটকে যায় সব ফাইল। এই সংঘবদ্ধ দুর্নীতি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার সেবাগ্রহীতা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ও সেবা, মেরামত ও সংরক্ষণ, উন্নয়ন কাজের বিল খালাস, পেনশন ও পারিবারিক পেনশন নিষ্পত্তি, অনুদান, জিপিএফ (GPF) ফান্ডের অগ্রিম ও চূড়ান্ত পরিশোধ, গৃহ নির্মাণ ঋণ, ভ্রমণ ভাতা এবং জিপিএফ ব্যালেন্স হস্তান্তরের মতো স্পর্শকাতর কাজগুলোতে চরম হয়রানি চালানো হচ্ছে। ঘুষের নির্দিষ্ট অংক না মিললে মাসের পর মাস কৃত্রিম অজুহাত তৈরি করে ঝুলিয়ে রাখা হয় ফাইল। অভিযোগের তীর সরাসরি জেলা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স অফিসের এস.এ.এস সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ তাজউদ্দীনের দিকে। সাতক্ষীরা সদরের মাগুরা এলাকার এই বাসিন্দা বিগত প্রায় তিন বছর ধরে একই অফিসে চেপে বসেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও ছত্রছায়ায় অফিসের একশ্রেণীর কর্মচারী কাজভেদে নির্ধারিত হারে ঘুষ দাবি ও আদায় করে থাকেন।
তাজউদ্দীনের এই ঘুষ বাণিজ্যের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন অফিসে মজুরিভিত্তিক কাজ করা অস্থায়ী শ্রমিক গৌতম। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়ায় জেলা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তা রহস্যজনক নীরবতা পালন করলেও পর্দার আড়াল থেকে দুর্নীতির টাকার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘুষের টাকা না দেওয়ায় একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন ও ভাতা মাসের পর মাস আটকে রাখার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। সাতক্ষীরা হর্টিকালচার সেন্টারের এক উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা গত ফেব্রুয়ারি মাসে কলারোয়া কৃষি অফিসে বদলি হন। তার বেতন স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় এলপিসি (LPC) আনতে হর্টিকালচার সেন্টারের কম্পিউটার অপারেটর জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে গেলে এস.এ.এস সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ তাজউদ্দীন সরাসরি ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ঘুষের টাকা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করায় ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ি ভাড়ার মিথ্যা অজুহাত তুলে আমার এলপিসি আটকে রাখা হয়েছে। এর ফলে আমি ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের বেতন, পবিত্র ঈদুল ফিতরের বোনাস এবং বৈশাখী ভাতা কোনোটিই পাইনি। বর্তমানে পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছি।
একজন সরকারি কর্মচারীর ন্যায্য পাওনা আটকে রেখে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ দাবি করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সুশীল সমাজ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে। দ্রুত এই সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের প্রধান মোঃ তাজউদ্দীন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের বিষয়ে এস.এ.এস. সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ তাজউদ্দীন বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা ঘুষ দাবি ও অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। কোনো সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে টাকা দাবি করিনি। সরকারি বিধি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কোনো ফাইল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা বিধিগত জটিলতার কারণে আটকে থাকলে সেটিকে ঘুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা ঠিক হবে না। তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করতে পারেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে কোনো আইনগত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা মেনে নিতে আমি প্রস্তুত। তবে যাচাই-বাছাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করা হলে এতে ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিকভাবে ক্ষতির সৃষ্টি হতে পারে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তা ইয়াসিন আলী বলেন, অফিসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সেবাগ্রহীতার কাছে ঘুষ দাবি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো সেবাগ্রহীতার বৈধ পাওনা বা সরকারি সুবিধা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা কিংবা অর্থের বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কেউ হয়রানি বা ঘুষ দাবির শিকার হলে লিখিতভাবে অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অফিসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা কর্মচারীর ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় পুরো দপ্তরের ওপর বর্তায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দায়ী করাও সমীচীন নয়। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এবিষয়ে খুলনা উপ-বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক তামান্না ইসলামের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। চলবে…..