আইনের রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। ঠিক তেমনি এক নজিরবিহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আটক বাণিজ্য ও ঘুষের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনি থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নোমান হোসেন (বিপি নং-৮৪১১১৪৫১৪৯)। তার একের পর এক ওপেন সিক্রেট অপকর্মের পাহাড় ট্রাইব্যুনাল ও পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত গড়ালেও, শাস্তির বদলে তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রূপনগর থানার ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৬ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে আশাশুনি থানায় যোগদানের পর থেকেই ওসি নোমান হোসেনের নেতৃত্বে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। থানা এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, ওসি নোমানের ছিল একটি শক্তিশালী ও সক্রিয় দালাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা রফিক নামের এক মোটরসাইকেল চালক এবং ওসির প্রধান সহযোগী ছিলেন থানার বকশি মাহফুজুর রহমান (বিপি নং-৮১০০০০৪৩৯২)। দালাল রফিকের হাতের লেখা মাসোহারার বেশ কিছু তালিকা প্রকাশ পাওয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে শহিদুল, আরিফ, মিলন মেম্বার, কবির, রুহুল আমিন, আরব আলী মেম্বারসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী ও ৩টি বাজারের ডজনখানেক দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা মাসোহারা তোলার সুনির্দিষ্ট হিসাব রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে ব্যর্থ হলেই নিরীহ মানুষকে নাশকতা বা হত্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে থানা থেকে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ রাজ্যেশ্বর বাবুর নিকট থেকে দালাল রফিকের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা এবং শ্রীউলা ইউপি চেয়ারম্যান দ্বীপঙ্কর বাছাড় দিপুর কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা ও একটি ১২ সেফটির ওয়ালটন ফ্রিজ উৎকোচ নেন ওসি নোমান। মানিকখালির বিসমিল্লাহ হ্যাচারির মালিক গাউসুল হোসেন রাজের নিকট থেকে বকশি মাহফুজুরের মাধ্যমে ২ লক্ষ টাকা এবং শ্রীউলার কোহিনুর হাজীর কাছ থেকে ঘেরের বিরোধ নিষ্পত্তির নামে আরও ২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এমনকি সাতক্ষীরা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. শিহাব উদ্দিনের কাছ থেকে নগদ ৩০ হাজার টাকা, কেজি কেজি নামী মাছ ও মধু নেওয়ার পরও আরও ৫ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের সুবিধা নিয়ে ড. শিহাব উদ্দিনকে গ্রেফতার করেন এই কর্মকর্তা। শ্রীউলা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিলের কাছ থেকে ৮ লক্ষ টাকা নিয়েও তাকে রেহাই দেননি ওসি নোমান।
ওসি নোমানের অপকর্মের পাল্লা এখানেই শেষ নয়। গত ২১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে জেলে ভাড়া করে থানার নিজস্ব পুকুর থেকে কাতল, রুই, মৃগেলসহ বিপুল পরিমাণ মাছ ধরেন তিনি। এসপি স্যারকে দেওয়ার নাম করে কৌশলে সেসব মাছ বকশি মাহফুজুরের সহায়তায় নিজের স্ত্রীর মাধ্যমে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন, যা পুলিশ মহলে চরম সমালোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া, প্রতাপনগর মৌজায় বাংলাদেশ পুলিশের মালিকানাধীন ১ একর ১৮ শতক জমিসহ ফাঁড়ির জায়গা সরকারি নিয়ম অমান্য করে গোপনে লিজ দেন ওসি নোমান। বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের নিকট থেকে বাৎসরিক ১০ হাজার টাকায় ২ বিঘা জমি লিজ দেওয়াসহ অন্যান্য জমি থেকে প্রাপ্ত সরকারি লিজের সমস্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে সরাসরি নিজের পকেটস্থ করেন তিনি।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার (পেনাল কোড নং- ৩০২/৩৪) এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি আশাশুনি উপজেলা আ.লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এ.বি.এম মোস্তাকিম আহমেদকে গত ২৭ মার্চ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২৮ মার্চ আশাশুনি থানায় আনা হলে তাকে হাজতখানায় না রেখে ওসির নিজস্ব কক্ষে এসি রুমে বসিয়ে জামাই আদর আপ্যায়ন করেন ওসি নোমান। মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ওসির গাড়িচালক বাচ্চুকে দিয়ে বেনসন সিগারেট এবং কনস্টেবল ফরহাদকে দিয়ে রেস্টুরেন্টের দামি নাস্তা আনিয়ে খুনের আসামির সাথে খোশগল্পে মেতে ওঠেন ওসি নোমান, যা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই প্রমাণিত হবে।
একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার হলে নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ সদর দপ্তর ও খুলনা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি রেজাউল হকের নির্দেশে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত হাসান খাঁন এবং সহকারী পুলিশ (তালা সার্কেল) মোঃ হাসানুর রহমান পৃথকভাবে তদন্ত পরিচালনা করেন। তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্তব্য কাজে অবহেলা, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের সত্যতা মেলায় গত ১২ এপ্রিল ওসি নোমান হোসেনকে আশাশুনি থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে সাতক্ষীরা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয় এবং নতুন ওসি হিসেবে সামছুল আরেফিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে শাস্তিমূলকভাবে সিলেট রেঞ্জের মৌলভীবাজারে বদলি করা হয়। জেলা পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তার বিরুদ্ধে কৈফিয়ত তলব করা হলে তার জবাব সন্তোষজনক হয়নি। যার প্রেক্ষিতে বিগত ০৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিঃ তারিখে তার বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং-৩২/২০২৬)। বেতার বার্তা নং- বি সার্কেল খুলনা/০১-২০২৬/১২৩৩ মূলে গত ০২ জুলাই ২০২৬ খ্রিঃ তারিখ পর্যন্ত মামলাটি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও খুনের আসামিকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়া এবং বিভাগীয় মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রূপনগর থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পদায়ন করায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন আইনের একজন রক্ষক এত অপরাধ করার পরও কীভাবে পার পেয়ে যান এবং শাস্তির বদলে উল্টো পুরস্কৃত হন? দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হলেও ওসি নোমানের এই রাজকীয় পুনর্বাসন পুলিশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বস্ততাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও কঠোর বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রূপনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ নোমান হোসেন সাংবাদিকের কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোঃ মোস্তাক সরকার বলেন, আমি তো এই বিষয়ে কোন কিছুই জানিনা। এজন্য কোন বক্তব্য দিতে পারছিনা এই মুহূর্তে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পুলিশ কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিন আহমদের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।