বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

“শিক্ষক থেকে পদত্যাগ” দূর্নীতি করে একই কর্মস্থলে ১৮ বছর বহাল

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ১৮৮ Time View
Update : সোমবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৫
সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক ও ভোকেশনাল শিক্ষক আহসান উল্লাহ

* পদত্যাগ করেও ১৮ বছর বহাল 
* পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে চাকরি 
* অনিয়মের কারণে বরখাস্ত 
* প্রধান শিক্ষকের ওভার রাইটিং  
* নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে দূর্নীতি 
* জালিয়াতি করে বেতন-ভাতা উত্তোলন 
* মুল হোতা প্রধান শিক্ষক, সভাপতি
সাতক্ষীরায় “শিক্ষক পদ থেকে পদত্যাগ” করে জালিয়াতির মাধ্যমে একই কর্মস্থলে ১৮ বছর বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, সাতক্ষীরা সদরের বল্লী মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল বিভাগীয় প্রধান মোঃ আহসানউল্লাহ শিক্ষক পদ থেকে পদত্যাগ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে চাকরি নেয়। এরপর বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির দায়ে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সেখান থেকে ফিরে এসে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতিকে ম্যানেজ করে নিয়মবহির্ভূত ভাবে পূর্বের কর্মস্থল বল্লী মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অবলীলায়  শিক্ষকতা করছেন আহসানউল্লাহ। আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় বহাল থেকে ১৮ বছরে তিনি অবৈধভাবে প্রায় ৩৭ লাখ ৬১ হাজার ২৭২ টাকা উত্তোলন করেছেন।  ইতিপূর্বে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন উল্লেখিত  প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন শিক্ষক -কর্মচারী। তবে অভিযোগটি কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই ধামাচাপা দেওয়ার দাবি উঠেছে। বল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে থাকা মোঃ আহসানউল্লাহ্’র জালিয়াতির তথ্য প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে। 
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৩ সালের ৩ জুলাই আহাসানউল্লাহ বল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভোকেশনাল শাখায় ট্রেড ইন্সট্রাক্টর হিসাবে যোগদান করেন। যোগদানের পরের বছরে এমপিও ভুক্ত হন এবং যথারিতি বেতন ভাতা উত্তোলন করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল বিদ্যালয় থেকে নিজের পদ হতে পদত্যাগ করেন আহসানুল্লাহ্। পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেজুলেশন পত্র থেকে। এরপর তিনি চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-০১ জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার পদে যোগদান করেন। যাহার ব্যক্তিগত আইডি নম্বর ০৯১১০৪১। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে চাকরিরত অবস্থায় ২০০৭ সালের মে, জুন, জুলাইয়ের বেতন ভাতা উত্তোলন করেন,যেটার একটি বেতন শিট প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকুরীরত অবস্থায় অসদাচরণ, নির্দেশ অমান্য, দায়িত্বে অবহেলার কারণে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ তাকে ২০০৭ সালের ১৩ আগস্ট চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর পুনরায় পূর্বের কর্মস্থল মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয় যোগদানের চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। তবে বিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে যাওয়ায় পুনঃরায় চাকরিতে সংযুক্ত হওয়াটা অফিসিয়াল নিয়ম বহির্ভূত। তবে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে আহসানুল্লাহ কোন প্রকার নিয়োগ যাচাই-বাছাই ছাড়াই পূর্বের পদে বহাল হন। রেজুলেশন সহ অন্যান্য বেশ কিছু কাগজপত্র জালিয়াতি করেন প্রধান শিক্ষক সহ সংশ্লিষ্ট কমিটির দায়িত্বরত ব্যক্তিরা। জালিয়াতির মাধ্যমে পুনঃরায় বেতন ভাতা উত্তোলনসহ পূর্বের পদে বহাল হয় আহসানউল্লাহ্। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে বহাল থেকে গত ১৮ বছরে প্রায় ৩৭ লাখ ৬১ হাজার ২৭২ টাকা উত্তোলন করেছেন।
বিধি বর্হিভূতভাবে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সকল সুবিধা ভোগ করে আসছেন তিনি। এ সমস্ত বিষয়ে তথ্য প্রমাণ সহ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেন ওই প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন শিক্ষক ও কর্মচারী। তবে মোঃ আহসানউল্লাহ সাতক্ষীরা সদরের রসুলপুর এলাকার আওয়ামী লীগের একজন পদধারী নেতা হওয়ায় দলীয় প্রভাব বিস্তার করে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষক আব্দুল আলীম জানান, বল্লী স্কুলে চাকরিতে থাকা কালীন নিজে পদত্যাগ করে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে চাকরি শুরু করেন আহসানউল্লাহ।
পরবর্তীতে সেখানে দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হন আহসানউল্লাহ। ফিরে এসে বল্লী স্কুলে পুনঃরায় চাকরিতে প্রবেশের নানা ধরনের চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আব্দুর রজ্জাক এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি’র মাধ্যমে রেজুলেশন খাতায় লেখা পদত্যাগপত্রের উপর ফ্লুইড ব্যবহার করে সেখানে ওভার রাইটিং করার মাধ্যমে  পদত্যাগপত্রের স্থলে চিকিৎসাপত্র লেখেন। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে জাল-জালিয়াতি করে পুনঃরায় তাকে চাকরিতে বহাল করেন। এ বিষয়ে আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম তবে দীর্ঘ একটি বছর অতিবাহিত হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত করেননি।
প্রতিষ্ঠান থেকে সদ্য বিদায়ী অফিস সহকারী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, আহসানউল্লাহ্ ২০০৭ সালে এপ্রিল মাসে পদত্যাগ করে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুতে চাকরিতে যান। চার মাস চাকরি করে সেখানকার চাকরি হারিয়ে ভূয়া একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও তৎকালীন সভাপতির সহযোগিতায় রেজুলেশনে ওভার রাইটিং করে চাকরিতে বহাল হয়। বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেন প্রধান শিক্ষক এবং সভাপতি। এ ব্যাপারে সমস্ত কাগজপত্র আমাদের সংগ্রহে রয়েছে। আওয়ামী লীগের সময়ে তিনি নিজেকে সরকার দলীয় লোক বলে দাবি করতেন এবং তদন্ত কার্যক্রম সহ এই সংশ্লিষ্ট কথা বললে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।
এদিকে শিক্ষক পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে অন্যাত্রে চাকরি করেন আহসানউল্লাহ। সেখান থেকে ফিরে নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই পূনরায় বল্লী মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্বপদে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বিধিবহির্ভূত ভাবে  বহাল তবিয়তে ১৮ বছর চাকরির ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছে। 
এ বিষয় মোঃ আহসানউল্লাহ মুঠোফোনে আলাপকালে বলেন, তিনি কখনো চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুতে চাকরিরত ছিলেন না। একপর্যায় তিনি তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। 
এ বিষয় বল্লী মোঃ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রজ্জাক বলেন, রেজুলেশন খাতায় কারিগরি বিভাগের শিক্ষক মোঃ আহসানউল্লাহর চিকিৎসাপত্রে কে বা কারা ফ্লুইড ব্যবহার করে ওভার রাইটিং করেছে তা আমার জানা নেই। পদত্যাগ করে আহসানউল্লাহ ফের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে স্বপদে ১৮ বছর বহাল থাকার ব্যাপারে তিনি অস্বীকার করেন। এ বিষয় সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শোয়াইব আহমাদ জানান, সম্ভবত এটার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ফাইল না দেখে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাচ্ছেনা।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com