বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

ছাত্রী নেই, কাগজে ১২২: ঘুষের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ৪০ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের শংকরকাটি খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবে কোনো ছাত্রী না থাকার অভিযোগের মধ্যেই কাগজে-কলমে ১২২ জন শিক্ষার্থীর তালিকা দেখানো, উপবৃত্তি উত্তোলন এবং ৮ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারীর সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও অভিযোগের পর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে শোকজ করা হলেও বেতন-ভাতা, এমপিও সুবিধা ও উপবৃত্তি কার্যক্রম নিয়ে দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ে প্রকৃত শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার জানা থাকার পরও দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উত্তোলন বন্ধ করা হয়নি। একই সঙ্গে কাগজে থাকা শিক্ষার্থীদের তালিকা ও উপবৃত্তির তথ্যের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) বেতন-ভাতার বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে অবৈধ সুবিধা নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি অর্থ উত্তোলনে সহযোগিতা করেছেন। তবে এই ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।ছাত্রী নেই, কাগজে ১২২ শিক্ষার্থী ধারাবাহিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ছাত্রী উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা থাকার চিত্রও পাওয়া গেছে। অথচ বিদ্যালয়ের নথিপত্রে ১২২ জন ছাত্রীর তথ্য থাকার কথা জানা গেছে।

প্রশ্ন উঠছে—যদি বাস্তবে বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী না থাকে, তাহলে ১২২ জন শিক্ষার্থীর তালিকা কীভাবে তৈরি হলো? ওই তালিকায় থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ভর্তি রেজিস্টার, জন্মনিবন্ধন, অভিভাবকের তথ্য, উপস্থিতির খাতা, শ্রেণিভিত্তিক রেজিস্টার এবং উপবৃত্তির হিসাব যাচাই করা হয়েছে কি না—এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার একটি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। উপবৃত্তির টাকা কার পকেটে?

বিদ্যালয়টিতে বাস্তব শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও উপবৃত্তির তথ্য থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর ফলে উপবৃত্তির তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীরা বাস্তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কি না, তারা নিয়মিত ক্লাস করে কি না এবং তাদের নামে উত্তোলিত অর্থ প্রকৃত শিক্ষার্থীরা পেয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বিশেষ করে উপবৃত্তির তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে সরেজমিন যাচাই, মোবাইল ব্যাংকিং/ব্যাংক হিসাবের তথ্য পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বক্তব্য নিলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ৮ শিক্ষক-২ কর্মচারীর বেতন-ভাতা নিয়েও প্রশ্ন: অন্যদিকে শিক্ষার্থী সংকটের মধ্যেও বিদ্যালয়ের ৮ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির থাকলেও এমপিও সুবিধার আওতায় সরকারি অর্থে বেতন-ভাতা উত্তোলন চলছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম না থাকে, তাহলে শিক্ষক-কর্মচারীরা কীভাবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন এবং কোন ভিত্তিতে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে?
এ ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের হাজিরা খাতা, ডিজিটাল/ম্যানুয়াল উপস্থিতির রেকর্ড, শ্রেণি রুটিন, পাঠদান রেজিস্টার এবং বেতন-ভাতা সংক্রান্ত ব্যাংক নথি যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। শোকজেই কি দায়িত্ব শেষ?

এর আগে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের আল আজাদকে শোকজ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়। নূর মুহাম্মদ (তেজারত) স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদান, পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি, শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য এবং বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

কিন্তু শোকজের পরবর্তী কার্যক্রম কী হয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা যাচাই করা হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি নিরীক্ষা করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি। শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১৫ শতাংশ ঘুষের অভিযোগ: সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত)-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ না করে তা উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি ১৫ শতাংশ হারে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে নূর মুহাম্মদ (তেজারত) মুঠোফোনে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শিক্ষার্থীশূন্য বিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং ভুয়া শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তি উত্তোলনে সহযোগিতা করার অভিযোগ সত্য নয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ফলে এখন প্রশ্ন—যদি অভিযোগটি ভিত্তিহীন হয়, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হবে কি না; আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য: সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত)-এর সঙ্গে কথা বলবেন এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন দেখার বিষয়, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন কাগজে থাকা ১২২ শিক্ষার্থীর তালিকা, উপবৃত্তির হিসাব এবং ৮ শিক্ষক ও ২ কর্মচারীর বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নথি কতটা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে। সচেতন মহলের মতে, অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে শুধু শোকজ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন— বিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের ভর্তি রেজিস্টার ও শিক্ষার্থী তালিকা যাচাই; তালিকাভুক্ত ১২২ শিক্ষার্থীর বাস্তব অস্তিত্ব ও অভিভাবকদের পরিচয় যাচাই।
শিক্ষার্থীদের শ্রেণিভিত্তিক উপস্থিতির রেকর্ড পরীক্ষা, উপবৃত্তির তালিকা ও অর্থপ্রাপ্তির ব্যাংক/মোবাইল হিসাবের ফরেনসিক যাচাই; ৮ শিক্ষক ও ২ কর্মচারীর উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম পরীক্ষা। গত কয়েক বছরের এমপিও বেতন-ভাতা উত্তোলনের হিসাব নিরীক্ষা। বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, তা যাচাই।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা ১৫ শতাংশ ঘুষের অভিযোগ স্বাধীন তদন্তে যাচাই; অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। এমপিও বাতিলের দাবি: স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে প্রকৃত শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া বা অসত্য তথ্য ব্যবহার করে সরকারি বেতন-ভাতা ও উপবৃত্তি সুবিধা নেওয়া হয়েছে, তাহলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ করছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যাচাই করতে হবে। তাদের দাবি, প্রকৃত শিক্ষার্থী নেই অথচ কাগজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ সত্য হলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সরকারি অর্থের হিসাব প্রকাশ করতে হবে।

এ বিষয়ে শংকরকাটি খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন এখন একটাই—শোকজের পর কি বিষয়টি ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে, নাকি ১২২ শিক্ষার্থীর তালিকা, উপবৃত্তি, ৮ শিক্ষক-২ কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা ১৫ শতাংশ ঘুষের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও আর্থিক তদন্ত হবে? শ্যামনগরের শিক্ষা প্রশাসনের কাছে এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা—কাগজের শিক্ষার্থী নয়, বাস্তব শিক্ষার্থী; কাগজের হিসাব নয়, প্রকৃত হিসাব—সবকিছুর স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে আনা হোক।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com