সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (সামেক) প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ সুব্রত কুমার দাসকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি নমুনা ও প্যাড পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সার্বিক বিষয় তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী এসব অভিযোগ নিয়ে সাতক্ষীরার তথ্যে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে দ্রুত তদন্তের লক্ষ্যে গঠন করা হয় তিন সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে যুগ্ম সচিব (সংগ্রহ ও ক্রয়) শফিউল আলমকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম এবং সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টাফ সুশান্ত মহাত্মা। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী কমিশন সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বিভিন্ন অজুহাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হতো। বিনিময়ে পরীক্ষার বিপরীতে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করা হতো। প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, কমিশনের এই অস্বাভাবিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান প্রকৃত পরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের হাতে রিপোর্ট তুলে দিচ্ছিল। এতে শুধু আর্থিক প্রতারণাই নয়, ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের জীবনও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছিল।
এছাড়া হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সরকারি রক্তের নমুনা ও সরকারি প্যাড বহিরাগত ক্লিনিক প্রতিনিধির কাছে পাওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। হাসপাতাল প্রশাসন নিজেই ওই ঘটনায় কৈফিয়ত তলব করে এবং পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য। মাসিক প্রায় ৪৯ হাজার টাকা বেতনের একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে নিজের ও স্ত্রীর নামে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় সর্বমহলে। জমি, ভবন, ব্যাংক হিসাব, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একজন কর্মচারীর দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উন্মোচিত হবে।
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জিম্মি করে কমিশন বাণিজ্য, সরকারি নমুনা বাইরে পাচার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই তদন্ত যেন কোনোভাবেই আইওয়াশে পরিণত না হয় এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহিতার অভাবে সংশ্লিষ্টরা পার পেয়ে গেছেন। তবে এবার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে আসা রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা, তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং সরকারি হাসপাতালের সেবার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। অভিযোগের পাহাড়ে চাপা পড়ে থাকা সত্য উদঘাটিত হবে, নাকি অতীতের মতো ধামাচাপা পড়বে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমেই।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ কুদরতি খোদা বলেন, সরকারি হাসপাতালে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করা হবে। তদন্তে যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।