আশাশুনিতে ভূমিদস্যুতা ও লুটপাটের অভিযোগ: শতাধিক পরিবার বাস্তুচ্যুত
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
/ ৪৩৭
Time View
Update :
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
Share
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৯ নম্বর আনুলিয়া ইউনিয়নে জমি দখল, লুটপাট ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস ও তার ভাই আমিনুর রহমান মিনুর বিরুদ্ধে ভয়াবহ সন্ত্রাসী তাণ্ডবের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের নেতৃত্বাধীন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অত্যাচারে সহায়-সম্বল হারিয়ে শতাধিক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপির নাম ব্যবহার করে রুহুল কুদ্দুস ও আমিনুর রহমান মিনুর নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র দল আনুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মৎস্যঘেরে হামলা চালায়। অভিযোগ রয়েছে—লুটপাট, ভাঙচুর, জোরপূর্বক জমি দখল এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, চক্রটির বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মারধর, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে অনেক পরিবার পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
মধ্যম একসরা গ্রামের হাকিম মোল্যা অভিযোগ করেন, গত বছরের আগস্টে তার বাড়িতে ঢুকে ছাগল, কবুতর, ধান মাড়াই মেশিন, ফ্রিজ, টিভিসহ আসবাবপত্র ও নগদ অর্থ লুট করে নেওয়া হয়। তিনি জানান, থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। বর্তমানে তিনি পরিবারসহ খুলনায় ভাড়া বাসায় থেকে দিনমজুরের কাজ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একই এলাকার রবিউল গাজীর দাবি, তার বাড়ি ও মুদিখানা দোকানে হামলা চালিয়ে গরু-ছাগলসহ প্রায় ২৬ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়। তিনি বলেন, বিষয়টি তৎকালীন থানার কর্মকর্তাকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন।
মধ্যম একসরা গ্রামের কালাম গাজী অভিযোগ করেন, তার বাড়িতে লুটপাটের পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ১৩ বিঘা জমির মৎস্যঘের জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সেনাবাহিনী ও থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। বর্তমানে তিনি খুলনার ডুমুরিয়ায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
আমজাদ সানা জানান, তার বাগদা চিংড়ি ও কাঁকড়া হ্যাচারির একাধিক ঘেরে লুটপাট ও দখল নেওয়া হয়। পাশাপাশি তার জমিতে রোপণ করা ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ায় সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সাদ্দাম সানার অভিযোগ, তার রেকর্ডীয় সাড়ে পাঁচ বিঘা মৎস্যঘেরের ভেড়ি কেটে জোরপূর্বক দখল নেওয়া হয়। বহু অনুরোধ করেও ঘের ফেরত পাননি বলে জানান তিনি। বর্তমানে তিনিও পরিবার নিয়ে খুলনায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রুহুল কুদ্দুস ও আমিনুর রহমান মিনুর নেতৃত্বে ৪০–৫০ জনের একটি সক্রিয় দল এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত। অভিযুক্তদের মধ্যে আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস এবং কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-যোগাযোগ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিনুর নাম উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে আনুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুসের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আগেও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, এতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।
অন্যদিকে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-যোগাযোগ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিনু বলেন, সামনে নির্বাচন রয়েছে—এ ধরনের সংবাদে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করার অনুরোধ জানান তিনি। পরে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের আশায় দিন গুনছে।