আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের নাকনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগের পর নতুন তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে। কোটি টাকার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রধান শিক্ষক নুরে আজমের সরাসরি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ শুধু অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নেই—তিনি নিজেই অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অথচ এতো স্পষ্ট স্বীকারোক্তির পরও প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পিইডিপি প্রকল্প-৪ এর আওতায় নির্মিত এই বিদ্যালয় ভবনের চুক্তিমূল্য ছিল ১ কোটি ৬১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮০০ টাকা। কাজটি শুরু হয় ২৪ জানুয়ারি ২০২১ এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৩ অক্টোবর ২০২১। তবে বারবার সময় বৃদ্ধি করে সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে কাজ শেষ করা হয়। দীর্ঘ এই সময়জুড়ে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার আবদুল হাকিমের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষক নুরে আজম বিদ্যুৎ বিলের অজুহাতে ২৩ হাজার টাকা আদায় করেন। পাশাপাশি সরকারি তহবিল থেকে ২৭ হাজার টাকা উত্তোলনের লিখিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি কেবল দৃশ্যমান অংশ—প্রকৃত অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
কাজটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন আশাশুনি উপজেলা প্রকৌশলী অনিন্দ্য দেব। কিন্তু এত বড় প্রকল্পে প্রধান শিক্ষকের এমন ভূমিকা কীভাবে নজরদারির বাইরে থেকে গেল—সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মুখে মুখে।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক নুরে আজম টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার বর্মন সাংবাদিকদের প্রশ্নে দায়িত্বশীলতার বদলে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “নিউজ করে কি করবেন? আপনার কলমে যতটুকু পারেন লেখেন। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এই বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা ও সদিচ্ছা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাঈদুজ্জামান হিমু তুলনামূলকভাবে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের দ্বারা এমন ঘৃণিত কাজ নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তথ্য দিন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য পাঠানোর অনুরোধ করেন।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতারের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেখানে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে যদি শিক্ষকই দুর্নীতিতে জড়ান, তবে সমাজ যাবে কোন পথে?” সচেতন মহল মনে করছে, শুধু তদন্তের আশ্বাস নয়—এই ঘটনায় দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা, অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এমন দুর্নীতি আরও উৎসাহ পাবে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে এলাকাবাসী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নাকি কেবল কথার ফুলঝুরি—তা প্রমাণের সময় এখনই।