মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৯ অপরাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

সাতক্ষীরার তথ্যের প্রতিবেদনে অধ্যক্ষ হুমায়ুন বদলি!

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ১৪১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

শোকজের ভয় দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের মুখ বন্ধ রাখা, তুচ্ছ কারণে ছাত্রীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করা, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৃশংস শারীরিক নির্যাতনের হুমকি, আর ভুয়া বিল-ভাউচারের মহোৎসবে সরকারি অর্থ লোপাট সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে যেন গড়ে উঠেছিল এক মগের মুল্লুক! প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবিরের একের পর এক রোমহর্ষক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার খবর জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।​ তীব্র ছাত্র আন্দোলন, জনরোষ এবং গণমাধ্যমের কড়া নজরদারির মুখে বিতর্কিত এই অধ্যক্ষকে বরগুনা জেলার চিফ ইনস্ট্রাক্টর (অটো) হিসেবে বরিশাল সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কারিগরি শাখা-০৪ থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপসচিব সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশে (স্মারক নং: ৫৭.০০.০০০০.০৫৪.১৯.০০৮.২৩.২০০) এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।​ তবে এই বদলিকেই শেষ ভাবছেন না ভুক্তভোগীরা।

সচেতন মহলের দাবি, শাস্তিমূলক বদলি কেবল প্রাথমিক পদক্ষেপ ও হুমায়ুন কবির এবং তার নেপথ্যের কুশীলবদের আর্থিক দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অপরাধের জন্য কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।​অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩ জুন যোগদানের পর থেকেই হুমায়ুন কবির কলেজে এক ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করেন। তুচ্ছ কারণে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণ দর্শানো (শোকজ) এবং বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) নষ্ট করার ভয় দেখাতেন তিনি। ৩৮তম বিসিএস-এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ইংরেজি ইনস্ট্রাক্টর প্রীতি সুন্দর বিশ্বাস এবং ইনস্ট্রাক্টর আজিয়ার রহমানকে সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই জনসমক্ষে অপমান ও শোকজ করা হয়। এমনকি তার মানসিক নির্যাতনে ভেঙে পড়ে সাবেক অফিস সহায়ক রুবেল আলী আত্মহত্যার নোট লেখার চেষ্টা করেছিলেন বলে সহকর্মীরা জানিয়েছেন। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের গায়ে হাত তোলা এবং চাকরিচ্যুতির হুমকি ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা।​হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। অষ্টম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীকে জোরপূর্বক হিজাব খুলতে বাধ্য করায় জান্নাতি নামের এক শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

এছাড়া, একাদশ শ্রেণির কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গোপনাঙ্গ কেটে নেওয়ার মতো নৃশংস ও বিকৃত হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।​ ভুয়া বিল-ভাউচার ও সরকারি অর্থ লুটপাটের ফিরিস্তি​ লুটেরা এই অধ্যক্ষের আর্থিক অনিয়মের খতিয়ান দীর্ঘ জানা গেছে, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য কেনা মাত্র ২০০ টাকার তোয়ালে ভাউচারে ১,৪৫০ টাকা দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। একই অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি ও দইয়ের দাম কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে বিল তোলা হয়।​ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ১ হাজার লিটার জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ভুয়া ইনডেন্ট দেখিয়ে বিপুল অর্থ তোলার পাঁয়তারা চালান তিনি।​ কলেজের প্রজেক্টর বাইরে ভাড়ায় খাটানো, কলেজের মোটরসাইকেল ও ৩০০ লিটার জ্বালানি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং রাইস কুকার, টেলিভিশন, খাট, ওভেনসহ যাবতীয় ব্যক্তিগত সামগ্রী কলেজের টাকায় কেনার অভিযোগ রয়েছে।​ ​সবচেয়ে বড় চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ মেলে তার আবাসন সুবিধায়।

হুমায়ুন কবির মূল বেতনের ৩৫% হারে প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে ২০,২৫৪ টাকা বাড়ি ভাড়া উত্তোলন করলেও মূলত চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত কলেজের অফিস কক্ষটিকে বিলাসবহুল আবাসিক ফ্ল্যাটে রূপান্তর করে বসবাস করছিলেন। এমনকি তার স্ত্রীও এসে সেখানে রাত্রিযাপন করতেন। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী অধ্যক্ষের নিয়োগ দেওয়া দুজন অফিস সহায়ককে দাপ্তরিক কাজের বদলে নিজের ব্যক্তিগত রাঁধুনি ও গৃহকর্মী হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং কলেজের তিনটি সাধারণ বাথরুম নিজের জন্য তালাবদ্ধ করে রাখতেন।​ তাছাড়া ​গত ২২ জুন রাতে একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে হুমায়ুন কবিরকে বলতে শোনা যায় সাতক্ষীরার মানুষ ভালো না। জামায়াতে ইসলামী ছাড়া বাদবাকি যারা আছে সব বেজন্মা। এই কুরুচিপূর্ণ আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ানোর বক্তব্য ফাঁস হতেই উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা তাকে ডিজিটাল ল্যাবে অডিও পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ জানালে তিনি সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন।

এরপর তড়িঘড়ি করে ২৩ জুন রাতে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়ে ও শিক্ষকদের ফোন কেড়ে নিয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ২৬ জুন ভোররাতে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে গোপনে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে যান এই অধ্যক্ষ।​অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হুমায়ুন কবিরের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছিল। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (এডি-০৫) মো. এনায়েত করিম এবং খুলনা আঞ্চলিক পরিদর্শক সুসান্ত কুমার সাহার প্রত্যক্ষ মদদে হুমায়ুন কবির পার পেয়ে যাচ্ছিলেন।​ গত ২৭ জুন লোক দেখানো তদন্তে আসেন সুসান্ত কুমার সাহা। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের নামে মাসোহারা আদায় করে দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষকে বাঁচাতে উল্টো বলির পাঁঠা বানানো হয় প্রতিষ্ঠানের সৎ ও জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক প্রীতি সুন্দর বিশ্বাসকে। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে পটুয়াখালীর গলাচিপায় স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। এর কিছুদিন পরই অপর এক সৎ শিক্ষক মো. জিয়াউর রহমানকে সুনামগঞ্জের ছাতকে বদলি করা হয়। মূলত, আসন্ন উচ্চপর্যায়ের তদন্তে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এবং তথ্য-প্রমাণ লোপাট করতেই সৎ শিক্ষকদের এভাবে হেনস্তা করা হয়।​

এমনকি হুমায়ুন কবিরের দোসর ভলান্টিয়ার শিক্ষক জাহিদ হাসান ও জুনিয়র শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অফিস কক্ষে ডেকে একাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক হুমায়ুন কবিরের পক্ষে মিথ্যা ভিডিও বক্তব্য ধারণের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করার নোংরা খেলায় মেতে ওঠে।​ ​মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক বদলির আদেশে কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও ক্ষোভ কমেনি স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের।​ বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন,​আমরা চোর তাড়াতে আন্দোলন করেছি, অথচ আমাদের পাশে থাকা সৎ শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের কেবল বদলি নয়, তাকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে জালিয়াতি ও লাঞ্ছনার বিচার করতে হবে এবং সৎ শিক্ষকদের পুনরায় সম্মানের সাথে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (ভোকেশনাল) প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানিয়েছেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা চেইন অব কমান্ড বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।​ কালিগঞ্জের সচেতন মহলের দাবি, বদলিকৃত হুমায়ুন কবির ও তার দোসর জাহিদ-নিয়াজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক একটি উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে লুণ্ঠিত সরকারি অর্থ উদ্ধার এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com