মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৩ অপরাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

তিন কর্মকর্তার পকেটে কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল!

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ৩৩৮ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা সরকারি টাকা আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দিতে এক অভিনব নাটক মঞ্চস্থ করার অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতিবাজ চক্রের হাত থেকে নিজের চেয়ার বাঁচাতে উল্টো বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত সৎ ও জনপ্রিয় ইংরেজি ইন্সট্রাক্টর প্রীতি সুন্দর বিশ্বাসকে। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই সম্পূর্ণ বিধি-বহির্ভূতভাবে তাকে পটুয়াখালীর গলাচিপায় বদলি করায় সচেতন মহল ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।​

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ হুমায়ুন কবিরের নানাবিধ অনিয়ম ও শিক্ষার্থীদের গোপন অঙ্গ কেটে নেওয়ার মতো নৃশংস হুমকির ঘটনা সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায়। এর প্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন (শনিবার) তদন্তে আসেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিদর্শক সুসান্ত কুমার সাহা। তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ এটি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ছিল না, বরং ছিল এক অভিনব প্রতারণার ফাঁদ।​অনুসন্ধানে জানা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তা সুসান্ত কুমার সাহা স্বয়ং অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং তার অসাধু উপার্জনের নিয়মিত মাসোয়ারা গ্রহীতা। কাকতালীয়ভাবে, ২৭ জুন ছিল সেই মাসোয়ারা আদায়ের নির্ধারিত তারিখ। তদন্তের নামে এসে নিজের মাসোয়ারা পকেটে পুরে উল্টো দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষকে বাঁচাতে মাঠে নামেন এই কর্মকর্তা। তারই ফলশ্রুতিতে, তদন্তের পরদিনই অর্থাৎ ২৮ জুন (রবিবার) কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার ও পেশিশক্তি খাটিয়ে ইংরেজি শিক্ষক প্রীতি সুন্দর বিশ্বাসকে পটুয়াখালীর দূরবর্তী অঞ্চলে বদলি করা হয়।​

তদন্ত ছাড়াই একজন সৎ শিক্ষককে এভাবে তড়িঘড়ি করে বদলির পেছনে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে জানা গেছে। অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোঃ এনায়েত করিম বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক-০৫ হিসেবে কর্মরত। বন্ধুর এই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায়, কোনো প্রকার শোকজ বা কারণ দর্শানো ছাড়াই প্রীতি সুন্দর বিশ্বাসের বদলি আদেশ জারি করানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।​

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বাসিন্দা মোঃ হুমায়ুন কবির ১৯৯৩ সালে চান্দখালী ইসহাক মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৬ সালে বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা পাস করেন। পরবর্তীতে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT) থেকে যথাক্রমে ২০০২ ও ২০০৩ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।​ মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের সুবাদে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী একজন বহুরূপী চরিত্র। বিগত আওয়ামী শাসনামলে তিনি ২০১৩ সালের উপ-নির্বাচনে বরগুনা-২ আসনের সাবেক বিতর্কিত এমপি শওকত হাসানুর রহমান রিমনের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং ওলামা লীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। অথচ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে তিনি খোলস বদলে ফেলেন। রাতারাতি নিজেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র সক্রিয় কর্মী দাবি করে বর্তমান প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

​​অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরের দুর্নীতির ইতিহাস এটাই প্রথম নয়। এর আগে ঝালকাঠি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ মেলে। যার শাস্তি স্বরূপ দীর্ঘ ৫ বছর তার বাৎসরিক বেতন ইনক্রিমেন্ট বন্ধ ছিল। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও জুনিয়র কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও, অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বন্ধু এনায়েত করিমের হাত ধরে সমস্ত নিয়ম নীতি তোয়াক্কা করে সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ার বাগিয়ে নেন তিনি। আর এই সমস্ত অপকর্মে তাকে প্রত্যক্ষভাবে রিফুয়েলিং বা সহযোগিতা করে যাচ্ছেন খুলনা আঞ্চলিক পরিদর্শক সুসান্ত কুমার সাহা।​ একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে নিজস্ব দুর্নীতির চারণভূমিতে পরিণত করা এবং ক্ষমতার জোরে সৎ শিক্ষকদের হেনস্তা করার এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে কালিগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সমাজ। অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং শিক্ষক প্রীতি সুন্দর বিশ্বাসের অন্যায় বদলি আদেশ বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ হুমায়ুন কবিরের সাথে কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদক কে বলেন, আমি আপনার সাথে কোন কথা বলতে রাজি নই। অলরেডি আমি সেখান থেকে চলে এসেছি। আপনাদের খুশি হওয়ার কথা। বলেই তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিদর্শক সুসান্ত কুমার সাহা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমার উপর মহলের নির্দেশে আমি সেখানে গিয়েছিলাম আমার পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা মাসোয়ারা গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শিক্ষক বদলির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো এখতিয়ার বা প্রভাব নেই। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও বিধি অনুযায়ীই আমার দায়িত্ব পালন করেছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ এনায়েত করিম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো ব্যক্তির বদলি বা পদায়ন এককভাবে আমার সিদ্ধান্তে হয় না। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধি-বিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা দেওয়া বা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সত্য নয়। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করতে পারে।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com