শোকজের ভয় দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের মুখ বন্ধ রাখা, তুচ্ছ কারণে ছাত্রীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করা আর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গোপনাঙ্গ কেটে নেওয়ার মতো নৃশংস হুমকি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ যেন হিমশৈলের চূড়ামাত্র। অনুসন্ধানে এবার বেরিয়ে এসেছে তার সীমাহীন আর্থিক দুর্নীতি, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত জমিদারির মতো ব্যবহারের আরও রোমহর্ষক সব তথ্য।
প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ট্রেডের শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক ফাঁকা বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। কোনো শিক্ষক এতে আপত্তি জানালে তাকে প্রকাশ্যে অপমান ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অভিযোগকারীরা জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রতিটি প্রায় ২০০ টাকা মূল্যের তোয়ালে কেনা হলেও, বিল-ভাউচারে সেগুলোর মূল্য দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা করে! এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি ও দইয়ের মূল্যও বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে সরকারি অর্থ পকেটস্থ করা হয়েছে। অর্থবছর (২০২৫-২৬) শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ১ হাজার লিটারেরও বেশি জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ভুয়া ইনডেন্ট দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা তোলার পাঁয়তারা করছেন তিনি। এমনকি পূর্ববর্তী অর্থবছরে কেনা পণ্যকে বর্তমান অর্থবছরের ক্রয় দেখিয়ে ভুয়া বিল প্রস্তুতের উৎসব চলছে। প্রতিষ্ঠানটির ইনডেন্ট বই ও স্টক রেজিস্টার নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই এই পুকুরচুরির প্রমাণ মিলবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কলেজের কার্যক্রম স্থগিত করার পর থেকে প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির কলেজ ক্যাম্পাসেই বসবাস শুরু করেন। নিয়মানুযায়ী সরকারি বাসা বা ক্যাম্পাসে থাকলে বাড়িভাড়া ভাতা কর্তন হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ভাতা তুলে নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, কলেজের টি-রুমকে নিজের ব্যক্তিগত রান্নাঘর বানিয়েছেন তিনি। রাইস কুকার, টেলিভিশন, গ্যাস ওভেন, খাট, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা ও রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম কেনা হয়েছে কলেজের টাকায়, যার ভাউচার মূল্য প্রায় ৩৯ হাজার টাকা।
কলেজের তিনটি বাথরুম সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে না দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তালাবদ্ধ করে রেখেছেন তিনি। এমনকি পূর্ববর্তী অধ্যক্ষের নিয়োগ দেওয়া দুজন অফিস সহায়ককে কলেজের কাজ বাদ দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত রাঁধুনি, বাজার করা ও কাপড় কাচার মতো গৃহকর্মী হিসেবে খাটাচ্ছেন।
শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস, শিক্ষার্থীরা বঞ্চিতভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের এই সীমাহীন লোভের বলি হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন কারিগরি বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারণ বরাদ্দের টাকা চলে যাচ্ছে অধ্যক্ষের পকেটে। এছাড়া এসএসসি-২০২৬ ব্যবহারিক পরীক্ষায় নিজ বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়ের এক্সটার্নাল (বহিরাগত পরীক্ষক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন তিনি, যা সম্পূর্ণ নীতিবহির্ভূত। নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রায়ই ছুটি কাটিয়ে এসে ব্যাকডেটে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন, যা সরকারি চাকরিবিধির চরম লঙ্ঘন। কোনো শিক্ষক প্রতিবাদ করলেই কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে চাকরিচ্যুতি বা এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) নষ্ট করার হুমকি দেন তিনি।
এসব সুনির্দিষ্ট ও নথিপত্রসহ গুরুতর সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বরাবরের মতোই দাম্ভিকতা ও উদাসীনতা প্রদর্শন করেন। তীব্র ক্ষোভ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সুরে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের স্বার্থে কেউ যদি আমার বিরোধিতা করে, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। তাছাড়া আপনি আমার বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশন করার দরকার নেই। আসেন, চা খাই। চায়ের দাওয়াত রইলো।
দুর্নীতির পাহাড় মাথায় নিয়ে গণমাধ্যমকে চায়ের দাওয়াতে ম্যানেজ করার এই অপচেষ্টাই প্রমাণ করে তিনি কতটা বেপরোয়া। এ বিষয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিদর্শক ও আঞ্চলিক পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুসান্ত কুমার সাহা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে যেসব অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে, সেগুলো লিখিতভাবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ আমাদের কাছে উপস্থাপন করা হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি-বিধান অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এই সিন্ডিকেট ও ত্রাসের রাজত্ব নিয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল খায়ের মোঃ আক্কাস আলীর (অতিরিক্ত সচিব) বক্তব্য জানার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি।
কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং এই পালের গোদাকে অপসারণ করে আইনের আওতায় আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহল।