“গাড়িচালক থেকে কোটিপতি: আশাশুনিতে তুলসীর ১০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য”
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
/ ৪৩২
Time View
Update :
রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
Share
সরকারি বিধি অনুযায়ী একজন গাড়িচালকের মাসিক আয়ের সীমা নির্দিষ্ট। কিন্তু সেই পদেই বসে যদি গড়ে ওঠে ১০ কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়, তবে প্রশ্নটা আর ব্যক্তির নয়—পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িচালক তুলসী আড়্যের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ক্ষমতার কেন্দ্রের একেবারে কাছাকাছি অবস্থানকে পুঁজি করে তিনি বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন জমি দখল, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি ও চিংড়ি পুশ সিন্ডিকেট।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি কোনো ‘ব্যক্তিগত উন্নয়ন’ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের জীবন্ত উদাহরণ। ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় চাপড়া–আশাশুনি সড়কে বাস চালাতেন তুলসী আড়্য। ইউএনওর গাড়িচালকের চাকরি পাওয়ার পরই বদলে যায় তার পরিচয়। শুরু হয় প্রভাব বিস্তার, ভয় দেখানো আর প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড।
স্থানীয় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তুলসীর নামে ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে— বুধহাটা বাজারে দেড় কোটি টাকা মূল্যের মার্কেট, বাড়ির পাশে তিনতলা দালান, ৩০ লাখ টাকা মূল্যের স’মিল, গ্রামে দোতলা ভবন, সাতক্ষীরা শহরের রাজারবাগে ডুপ্লেক্স বাড়ি, মহেশ্বকাটিতে প্রায় ৬০–৭০ বিঘা মৎস্য ঘের সব মিলিয়ে সম্পদের আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি—যার বৈধ আয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও মেলেনি।
জমি জালিয়াতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ দখলের অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৪ সালে বুধহাটা শেতপুর মৌজায় কেনা সাড়ে ১০ বিঘা জমির কাগজ জাল করে ১১ বিঘা দেখিয়ে বিক্রি করা হয়। এছাড়া শেতপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের ২৫ শতক জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, পরে জমি উদ্ধার হলেও তার ঘেরের মাটি ভরাটে আজও জলাবদ্ধতায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, জমি ফেরত চাইলে কিংবা মুখ খুললেই শুরু হয় মিথ্যা মামলা ও হয়রানি। একাধিক মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
মহেশ্বকাটি এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের অভিযোগ দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে ইউএনওকে ভুল তথ্য দিয়ে অভিযান চালানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযুক্তের অস্বীকার, প্রশাসনের দায়সারা বক্তব্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে তুলসী আড়্য দাবি করেন, তিনি নাকি ‘সৎভাবেই’ সম্পদ গড়েছেন। তবে সম্পদের উৎসের কোনো বিশ্বাসযোগ্য নথি তিনি দেখাতে পারেননি।
অন্যদিকে ইউএনও মোঃ সাইদুজ্জামান হিমু বলেছেন, “বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।” সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতারের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। বড় প্রশ্ন একজন চুক্তিভিত্তিক গাড়িচালক কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এমন অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে? প্রশাসনের চোখের সামনে চলা এসব কর্মকাণ্ড এতদিন অদৃশ্য ছিল কীভাবে? নাকি ক্ষমতার বলয়ই ছিল তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা? এখন দেখার বিষয়—তদন্ত হবে, নাকি এই ঘটনাও চাপা পড়বে প্রভাবশালীদের ছায়ায়?