সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি গাজী শাহ আলমকে ঘিরে দিন দিন বাড়ছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, গরু পারাপার, জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। নানা অভিযোগে বারবার আলোচনায় এলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসনিকভাবে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শাহ আলম একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে কালিন্দী নদীপথ ব্যবহার করে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র আনয়নের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, এসব অস্ত্র পরবর্তীতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাতক্ষীরা ৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় শাহ আলম নিকটতম আত্মীয় হওয়ার সুবাদে কৈখালী সীমান্তবর্তী কালিন্দী নদী পথ ব্যবহার করে অস্ত্র মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি অবৈধভাবে চুরি করে গরু পারাপার করতো। ভারত থেকে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা এসব গরু পরবর্তীতে চড়া দামে বিক্রি করতো শাহ আলম। সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় গরু চোর শাহ আলমের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও ভয় পান। এলাকাবাসীর দাবি, নিজেকে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে শাহ আলম প্রায়ই প্রকাশ্যে বলে বেড়ান— প্রশাসন থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের অনেকেই তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক বাসিন্দা।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন শাহ আলম। সে সময় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায় বলে দাবি স্থানীয়দের। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আবার নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জেলা কমিটিতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ ওঠার পর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে তাকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শ্যামনগর থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় শাহ আলমের অনুসারীরা জড়িত ছিল। একই দিনে পরানপুর বাজারের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত লুটপাটের ঘটনাতেও তার সিন্ডিকেটের নাম উঠে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, কোটি টাকার মালামাল লুট হলেও অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাননি।
এদিকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি যৌথ বাহিনীর অভিযানে তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পরও থেমে নেই সিন্ডিকেটের তৎপরতা। বরং অভিযোগ উঠেছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিলাসী জীবনযাপন ও নারীসঙ্গ নিয়ে বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন শাহ আলম। ঢাকা ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় হোটেলে নারীদের নিয়ে ফুর্তির অভিযোগ এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
সম্প্রতি এক নারীর সঙ্গে তার আপত্তিকর কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভাইরাল হওয়া ওই অডিও ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একজন বিতর্কিত ব্যক্তির এমন বেপরোয়া আচরণ সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তরুণদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। কৈখালী ইউনিয়নের কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, শাহ আলমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা হামলার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই নীরবে সব সহ্য করছেন। স্থানীয় সচেতন মহল, ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবি, শাহ আলম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র ও মাদকের বিস্তার আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শাহ আলম।