সাতক্ষীরা জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের ধারাবাহিক সাক্ষ্যে স্পষ্ট হয়েছে, এটি আর গুজব নয়; বরং একটি সংগঠিত, পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চক্র।
গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস প্রধান মোস্তফা জামান তার দায়িত্বকালীন সময়ে অফিসটিকে কার্যত ঘুষনির্ভর এক ‘অবৈধ কারখানায়’ রূপান্তর করেছিলেন—এমন অভিযোগ এখন স্থানীয়ভাবে ওপেন সিক্রেট। বিদেশগমন প্রত্যাশী অসহায় মানুষদের জিম্মি করে সরকারি প্রক্রিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিপুল সম্পদের পাহাড়, যার কোনো বৈধ উৎস আজও জনসমক্ষে আসেনি।
অভিযোগের তীর শুধু সাবেক অফিস প্রধানের দিকেই নয়। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত জনশক্তি জরিপ অফিসার মোঃ আব্দুল মজিদ ও অফিস সহকারী আব্দুস সালাম-এর বিরুদ্ধেও গুরুতর হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনশক্তি জরিপ অফিসার মোঃ আব্দুল মজিদের নামে সাতক্ষীরা জজ কোর্ট মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় সাড়ে ৪ কাঠা জমির ওপর প্রাচীরঘেরা একটি বাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। স্থানীয়দের জোরালো অভিযোগ—সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এই সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থ এলো কোথা থেকে?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হতো ইচ্ছাকৃতভাবে জরিপ রিপোর্ট বিলম্ব করা হতো কখনো কাগজে ত্রুটি, কখনো ‘সিস্টেম ডাউন’, আবার কখনো নতুন জরিপের অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হতো প্রতিবাদ করলেই শুরু হতো ভয়ভীতি, চাপ ও মানসিক নির্যাতন।
একাধিক বিদেশগমন প্রত্যাশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঘুষ দিলেই কাজ, না দিলে শুধু ভোগান্তি। আমরা গরিব মানুষ—বিদেশ গিয়ে পরিবার বাঁচাতে চাই। কিন্তু এখানে টাকা ছাড়া এক কদমও এগোনো যায় না।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাবেক অফিস প্রধান মোস্তফা জামানের মৌখিক নির্দেশেই মাঠপর্যায়ে জরিপ কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মজিদ পরিকল্পিতভাবে রিপোর্ট আটকে রাখা ও নেতিবাচক মন্তব্য জুড়ে দিয়ে বিদেশগমন প্রত্যাশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জনশক্তি জরিপ অফিসার মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন, “রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এসব দেখাশোনা করেন আমাদের অফিসের আব্দুস সালাম সাহেব। আপনি অফিসে আসুন, চা খাই।”
অন্যদিকে, আব্দুস সালাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি সামান্য কর্মচারী। যা করেছেন স্যার করেছেন। আমি কিছুই জানি না।” দায় চাপানোর এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে আরও স্পষ্ট হচ্ছে—দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে।
সাবেক অফিস প্রধান মোস্তফা জামানের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগের মুখে তার এই নীরবতা জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এমন গুরুতর অভিযোগ চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন? কাদের ছত্রছায়ায় এতদিন ধরে এই দুর্নীতির চক্র নির্বিঘ্নে চলেছে? স্বাধীন তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সুশীল সমাজ ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সাবেক অফিস প্রধান মোস্তফা জামান জনশক্তি জরিপ অফিসার মোঃ আব্দুল মজিদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আব্দুস সালাম এর বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যথায় জনশক্তি অফিসের নামে চলমান এই দুর্নীতির কারখানা বন্ধ হবে না—এটাই এখন জনমতের ভাষা।