সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

ঘুষ–দুর্নীতির রসের হাঁড়ি সাতক্ষীরা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ২৯৪ Time View
Update : শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫

ভোগান্তির আরেক নাম সাতক্ষীরা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস। ঘুষ ছাড়া এখানে যেন কোন কাজই হয় না। প্রতিদিন আঙ্গুলের ছাপ দিতে আসা শত শত বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভুতভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এখানকার সাবেক অফিস প্রধান মোস্তফা জামান নিজেই এবং তার নির্ধারিত কয়েকটি দালাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদায় করেছেন এ সকল টাকা। এতে করে প্রতিদিনই আঙ্গুলে ছাপ দিতে আসা শত শত বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিদেরকে পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তীতে।

জানা গেছে, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, মালেশিয়া, দুবাই, কাতার সহ বেশ কয়েকটি দেশে শ্রমিক ভিসায় যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নীতিমালা অনুসারে সংশ্লিষ্ট দেশের দুতাবাসের ইস্যু করা ভিসার সত্যায়ন কপি প্রাপ্তি সাপেক্ষে স্ব-স্ব জেলার জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো কার্যালয়ে কোন ধরনের ফি ছাড়াই আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ সাতক্ষীরা জেলার কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কার্যকলাপে দেখা যায় একেবারেই ভিন্ন চিত্র। সাবেক কর্মকর্তা বদলালেও এখানে বর্তমানে দায়িত্ব রত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলায়নি চরিত্র।

প্রতিদিন এখানে আঙ্গুলের ছাপ দিতে আসা শত শত বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিদেরকে পড়তে হচ্ছে চরম বিরম্বনায়। টাকা নেয়ার বিধান না থাকলেও প্রতিটি কাজেই এখানে দায়িত্বরত অফিস কর্মকর্তারা বিভিন্ন অজুহাতে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। কোন ব্যক্তি টাকা দিতে অপারাগতা প্রকাশ করতেই তাকে হতে হয় হেনস্তার স্বীকার।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিরা আঙ্গুলের ছাপ দিতে চলে আসেন সাতক্ষীরা পৌর এলাকার সদর হাসপাতাল সংলগ্ন চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে। এরপর আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে পিন্ট বের হতেই দেখা যায় এক দেশের জায়গায় চলে আসছে আরেক দেশের নাম। অর্থাৎ কাতার যাওয়ার ব্যক্তির চলে আসে ডুবাই বা সৌদিআরব যাওয়ার ব্যক্তি চলে আসছে সিংঙ্গাপুর। এরপর এ কাজের দায়িত্বে থাকা উজ্জ্বল প্রিন্টের সংশধনের জন্য অফিস ভবনের নিকটে থাকা নির্ধারিত কম্পিউটারের দোকানে তাদেরই এক দালাল প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে সংশোধনীর জন প্রতি নেয়া হয় ১২শ’ টাকা। এর সাথে দেয়া হয় জবশিখা নামের আরেকটি ফরম। সেখানে নেয়া হয় ২ থেকে ৩শ’ টাকা। অফিস খরচ দেখিয়ে এ ভাবে টাকা নেয়ার পরও চা-পানির খরচা বাবদ আরো দিতে হয় দেড় দুইশত টাকা।

শুধু তাই নয়, পূর্বের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিদেরকে পরতে হয় আরো ভোগান্তীতে। দেখা গেছে, আঙ্গুলের ছাপ দিতে আসা নতুন পাসপোর্ট অর্থাৎ ই-পাসপোর্টধারী ব্যক্তিদেরকে ব্যাংকে জমা দিতে হয় ২২০ টাকা। কিন্তু পুরাতন পাসপোর্টধারীদের ক্ষেত্রে আবার এই টাকাটা ব্যাংকের পরিবর্তে দিতে হয় বিকাশ, নগদ কিংবা রকেট একাউন্টে। ততে দেখা যায়, অফিসের লোকদের এ সকল একাউন্টের মাধ্যমে এ টাকা পেমেন্ট করা হলে সেই ক্ষেত্রে এক দুই দিন বিলম্ব দেখিয়ে ঢাকা হেড অফিসের মাধ্যমে এ কাজ দ্রুত করানোর অজুহাতে ওই সকল প্রবাশীদের কাছ থেকে জন প্রতি নেয়া হচ্ছে ৮-১০ হাজার টাকা। কখনো তার চেয়েও কয়েক গুন বেশি।

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে দেখা যায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিদের পদচারনা। কেউ কেউ বাড়তি টাকা দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করে চলে যেতে পারলেও অধিকাংশরাই না জেনে বাড়ি থেকে বাড়তি টাকা না নিয়ে অফিসে এসে তাদেরকেই পড়তে হয় নানা বিরম্বনায়।

কথা হয় সৌদিআরবে যেতে ইচ্ছুক আশাশুনি উপজেলার দক্ষিণ চাপড়া গ্রামের ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ আলিমের সাথে। অফিসে আঙ্গুলের ছাপ দেয়ার পর কম্পিউটার থেকে তার তার ফিঙ্গার প্রিন্ট বের হতে দেখা যায় তার পছন্দের সৌদিআরবের স্থানে চলে আসছে কাতার। বিষয়টি দেখেতো তার চোখ যেনো কপালে ওঠে গেছে। অবশ্য মুহূর্তের মধ্যেই এর সমাধানের পথও দেখিয়ে দিলো এই কাজের দায়িত্বে থাকা উজ্জ্বল দেশের নাম সংশোধনের জন্য অফিস ভবনের নিকটে থাকা কম্পিউটার নামের ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তা সংশোধন করে নিয়ে আসতে বলে। এরপর সেই প্রতিষ্ঠানে এ কাজের সংশোধনীতে বাধ্যতামূলক ভাবে দিতে হয়েছে ১২শ’ টাকা। এরসাথে করতে হয় জবশিকা নামক আরো একটি ফরম। তাতেও দিতে হয় ৩শ’ টাকা। একই কাজে এসে সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের বাসিন্দা ইমানউদ্দীনও দেখতে পায় তার ফিঙ্গার প্রিন্টে দৌদিআরবের স্থানে চলে আসছে ওমান। সংশোধনের জন্য তাকেও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানে। এরপর ১২শ’ টাকা খরচের মধ্য দিয়ে সংশোধন হয়েছে পরিবর্তিত হওয়া দেশের নাম।

শুধুই তাই নয়, পূর্বের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিদেরকে পরতে হয় আরো ভোগান্তীতে। কেননা নতুন পাসপোর্ট অর্থাৎ ই-পাসপোর্টধারী ব্যক্তির ২২০ টাকা ব্যাংকে জমা দেয়া লাগলেও পুরাতন পাসপোর্টদারীদের ক্ষেত্রে সেই টাকা দিতে হয় বিকাশ, নগদ কিংবা রকেট একাউন্টে। তাতে করে ওই সকল প্রবাশীদেরকে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে তাদের কাছ থেকেও জন প্রতি নেয়া হচ্ছে ৮-১০ হাজার টাকা।

যদিও এ সকল টাকা মাঝে মধ্যে হেন্ডকেস নেয়া হলেও অধিকাংশ সময়ই সাবেক অফিস প্রধান মোস্তফা জামানের নাম্বারে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে নেয়া হয় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

এদিকে ফিঙ্গার প্রিন্টে এক দেশের স্থানে আরেক দেশ চলে আসার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বিষয়টি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিতে তিনি বলেন, সবই হচ্ছে আমাদের কারসাজি। স্যারে আমাদেরকে যে ভাবে বলে আমাকেতো সে ভাবেই করতে হয়। যদিও কিছু কিছু সঠিকই প্রিন্ট বের করতে হয়। তা না হলে আবার বিভিন্ন জনের প্রশ্নের সম্মুক্ষিন হতে হবে।

একই ভাবে বিষয়টি গোপন রাখতে বলে সংশোধনের জন্য ১২শ’ টাকা নেয়ার বিষয়ে অফিসের নিকটবর্তী কম্পিউটারের মালিক এর ছেলে জানান, ১২শ’ টাকার ২শ’ টাকা আমরা পাই, আর ১ হাজার টাকা অফিস প্রধান মোস্তফা স্যারকে তার পার্সনাল নাম্বারের কখনো বিকাশ আবার কখনো নগদ একাউন্টে পাঠিয়ে দেয়।

যদিও সাবেক কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস প্রধানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পুর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে মোস্তফা জামান বিষয়টিকে হাসিরছলে উড়িয়ে দিয়ে এ নিয়ে কোন সংবাদ প্রচার না করতে এই প্রতিবেদককে বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজের চেষ্টা করেন তিনি।

এদিকে দীর্ঘ দিন যাবত এই কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে চলা অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি ওপেন সিকরেট হলেও এ নিয়ে একেবারেই নির্বিকার জেলা প্রশাসন এমনটি দাবী করে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সচেতন মহল। এটিকে খুবই দুঃখ ও লজ্জাজনক আক্ষাদিয়ে সাতক্ষীরা জেলা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম খান মামুন বলেন, অনিয়ম দুর্নীতি অধিকাংশ অফিসেই কম বেশি হয়ে থাকলেও সাতক্ষীরা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে ব্যাপক ঘুষ বানিজ্যের কথা শুনা যায় আমাদেরই বহু আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিদেশ গমন ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছে। আসলেই আমাদের সাতক্ষীরা জনগনের জন্য এটি খুবই লজ্জাজনক। একই কথা বলে সাতক্ষীরা অপরাধী উন্মোচন ক্লাবের সভাপতি মোঃ ইব্রাহিম খলিল বলেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ গরীব অসহায় ব্যক্তিরা সহায় সম্বল বিক্রি করে বিদেশ গিয়ে তাদের কষ্টে উপার্জিত রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতির একটি বিশাল ঘাড়তি পুরণ করে। অথচ সেসকল মানুষ গুলোকে এই অফিসের অসৎ কর্মকর্তার দিনের পর দিন চুষে খাচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর শস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা দরকার বলে আমি মনে করি।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com