সরকারি হাসপাতাল মানেই সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে সরকারি চিকিৎসা সেবা যেন পরিণত হয়েছে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত উপার্জনের হাতিয়ারে। বিশেষ করে হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার তীব্র অভিযোগ উঠেছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইনচার্জ) মো. আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে যোগদানের পর থেকেই তিনি ও তার গড়ে তোলা সিন্ডিকেট চক্র হাসপাতাল চত্বরে গড়ে তুলেছেন এক সমান্তরাল লুটপাট সাম্রাজ্য। অনুসন্ধানে ও সরেজমিনে জানা যায়, সরকারি নির্ধারিত অফিস সময় পার হতেই সামেক হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের চিরাচরিত রূপ বদলে যায়। সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্য সরকারি চালানের নিয়ম থাকলেও, ইনচার্জ আব্দুল হালিমের নির্দেশে চালু হয় তার নিজস্ব ক্যাশ কাউন্টার। এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও সিটি স্ক্যান রুমের সামনে অবস্থান নেয় হালিমের নিজস্ব দালাল সিন্ডিকেট।
গত ২৪ আগস্ট (সোমবার) দুপুর ৩টার দিকে হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এই অনিয়মের প্রমাণ মেলে। দেবহাটার হাড়দহা এলাকা থেকে আসা রাশিদা নামের এক রোগী সিটি স্ক্যান করানোর জন্য অপেক্ষারত ছিলেন। এ সময় ইনচার্জ হালিমের অনুগত দালাল চক্রের সদস্য জৈনক কামরুল ইসলাম রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে সিটি স্ক্যানের জন্য সরকারি রসিদ ছাড়া একটি সাদা টোকেন-এর মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেন। সরকারি বিল-ভাউচার বা চালানের তোয়াক্কা না করে কেন এই অবৈধ টোকেনে টাকা নেওয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের মুখে পড়ে কোনো সদুত্তর না দিয়ে দ্রুত সটকে পড়েন অভিযুক্ত কামরুল। স্থানীয় ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, প্রতিদিন দুপুর গড়ালেই এই বিভাগে মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়, যার কোনো হিসেব সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না। সরকারি খাতায় টাকা জমা না হয়ে পুরোটাই চলে যায় ইনচার্জ হালিম ও তার সিন্ডিকেটের পকেটে। দিন শেষে সন্ধ্যায় হালিম ও কামরুলসহ চক্রের সদস্যরা একত্রিত হয়ে সেই অবৈধ টাকা ভাগবাটোয়ারা করেন বলে গোপন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২০১৭ সাল থেকে অদ্যবধি এভাবে রোগীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। ইতিপূর্বে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েও তিনি নানা ধরনের অপকর্ম ও অর্থনৈতিক অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন।উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্নইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আব্দুল হালিমের এসব অপকর্ম ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির খবর প্রকাশিত হলেও অজ্ঞাত কারণে রহস্যজনক নীরবতা পালন করেছে হাসপাতাল প্রশাসন। ফলে পার পেয়ে গিয়ে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এই টেকনোলজিস্ট। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি অবিলম্বে সামেক হাসপাতালের ইমেজিং ও রেডিওলজি বিভাগকে দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে হালিম ও তার সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইনচার্জ) মো. আব্দুল হালিম বলেন, আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিক নয় এবং বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে। রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালের প্রচলিত নিয়ম ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি নিয়মের বাইরে রোগীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে, তাহলে তার দায় ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছি এবং কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া বা রোগীদের হয়রানি করার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত করুক। নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উদঘাটিত হলে আমি তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ শেখ কুদরত-ই খোদা বলেন, সরকারি হাসপাতালে কোনো ধরনের অনিয়ম, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বা সরকারি রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কেউ সরকারি নিয়মের বাইরে রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকলে বা সরকারি রসিদ ছাড়া অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবসময় সচেষ্ট। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, ভিডিও, ছবি বা অন্যান্য প্রমাণ থাকলে তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানাই। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এবিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আপনি ডকুমেন্টগুলো আমাকে পাঠান। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।