সাতক্ষীরার তালা উপজেলার সুজনসাহা বাজারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৭ বস্তা চাল ডিলারের গুদাম থেকে অন্যত্র নেওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকার নির্ধারিত ১৫ টাকা কেজি দরের চাল গুদাম থেকে ভ্যানে করে একটি বাড়িতে নেওয়া হলেও বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করার পরও তাৎক্ষণিক কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে তালা উপজেলার সুজনসাহা বাজারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের গুদাম থেকে ১৭ বস্তা চাল একটি ভ্যানে করে ইসলামকাটি ইউনিয়নের সুজনসাহা গ্রামের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য খোসরুল আলমের বাড়িতে নেওয়া হয়। চাল পরিবহনে আহাদ নামের এক ভ্যানচালক ছিলেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি সকাল ৯টা ৫৩ মিনিটের দিকে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণাকে জানানো হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে চাল জব্দ বা কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ডিলার মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সেলিনা খাতুনের স্বামী মুঠোফোনে বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, গুদাম সংস্কারের জন্য চাল বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য খোসরুল আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির গুদাম থেকে চাল ভ্যানযোগে নিজের বাড়িতে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। চাল বহনকারী ভ্যানচালক আহাদও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তিনি তার ভ্যানে করে ১৭ বস্তা চাল বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে অডিটের কারণে বিকেলে চালগুলো আবার গুদামে নিয়ে আসার কথা ছিল বলেও জানান তিনি।
ঘটনা সম্পর্কে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল গুদাম থেকে অন্যত্র নেওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন। চেয়ারম্যান তাকে জানিয়েছেন, গুদাম সংস্কারের উদ্দেশ্যে চালগুলো বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। ইউএনও বলেন, সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল গুদাম থেকে অন্যত্র রাখা যাবে না, সংস্কারের প্রয়োজন হলেও নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নিতে হবে। খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বক্তব্যে অনুমতির প্রশ্ন: তালা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ইসলামকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুদাম সংস্কারের জন্য চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে ১৭ বস্তা চাল ডিলারের বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সভাপতি হিসেবে চেয়ারম্যানের ভূমিকা রয়েছে এবং তার অনুমতি নিয়ে চাল অন্যত্র রাখা যেতে পারে। তবে ডিলারপক্ষের দেওয়া বক্তব্যে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে স্বীকারোক্তি থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—চাল অন্যত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের অনুমতি প্রয়োজন এবং সেই অনুমতি যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না।
১৫ টাকা কেজির চাল, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন: সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের কার্ডধারী পরিবারকে নির্ধারিত মূল্যে চাল সরবরাহ করা হয়। কর্মসূচির আওতায় একজন কার্ডধারী মাসে ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের সরকারি খাদ্য কর্মসূচির চাল ডিলারের গুদাম থেকে অনুমোদন ছাড়া অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটলে তা সুষ্ঠুভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালের প্রকৃত মজুত, বিতরণ রেজিস্টার, কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণের হিসাব এবং গুদাম থেকে ১৭ বস্তা চাল সরানোর কারণ ও অনুমোদনের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং দায়ী ডিলারের লাইসেন্সের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, চালগুলো গুদাম সংস্কারের উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। ফলে চাল সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া, অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে চালের মজুত—এসব বিষয় যাচাই করলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।