সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এর বিরুদ্ধে গ্রাহকের সঞ্চয় ও জামানতের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি ও টালবাহানার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সমিতিতে জমা রাখা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সঞ্চয় ফেরত না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন পাটকেলঘাটা কুমিরা এলাকার বাসিন্দা মোঃ আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবার।অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মৃত আতিয়ার সরদারের ছেলে মোঃ আবু সাঈদ ২০১১ সালে পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এ হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। চাকরির সুবাদে তিনি নিজ নামে এবং স্ত্রী ও স্ত্রীর ভাইয়ের নামে সমিতিতে বিভিন্ন মেয়াদি সঞ্চয় ও বীমা হিসাব খোলেন। বর্তমানে এসব হিসাবের বিপরীতে তাঁর পরিবারের মোট ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৫৮ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবু সাঈদ নিজ নামে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল ১০ বছর মেয়াদি একটি বীমা হিসাব খোলেন।
বর্তমানে ওই হিসাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল তাঁর নামে খোলা ১০ বছর মেয়াদি সঞ্চয় হিসাবে রয়েছে ৪৫ হাজার ৩৯৮ টাকা। আবু সাঈদের স্ত্রী আসমা খাতুনের নামেও রয়েছে একাধিক হিসাব। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি খোলা সঞ্চয় হিসাবে বর্তমানে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬০ টাকা জমা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল খোলা ১০ বছর মেয়াদি বীমা হিসাবে রয়েছে ৬০ হাজার টাকা এবং ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর খোলা আরেকটি ১০ বছর মেয়াদি বীমা হিসাবে রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। এছাড়া আসমা খাতুনের ভাই, যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি বগা এলাকার রকিবুল ইসলামের ছেলে ইমরানের নামেও সমিতিতে দুটি মেয়াদি বীমা হিসাব রয়েছে। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল খোলা ১০ বছর মেয়াদি বীমা হিসাবে বর্তমানে ৬০ হাজার টাকা এবং ২০১৮ সালের ৪ মার্চ খোলা আরেকটি ১০ বছর মেয়াদি বীমা হিসাবে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ২০১১ সালে সমিতিতে চাকরিতে যোগদানের সময় আবু সাঈদ ৪০ হাজার টাকা জামানত হিসেবেও জমা রাখেন বলে দাবি করেছেন। সব হিসাব ও জামানতের টাকা মিলিয়ে পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এর কাছে আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবারের সর্বমোট ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৫৮ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আবু সাঈদ গত প্রায় দুই বছর ধরে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাঁর পরিবারের দাবি, এই অসুস্থতা ও অসহায়ত্বের সুযোগে পাওনা টাকা ফেরত না দিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে বারবার সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। পাওনা টাকা ফেরতের জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও আশানুরূপ প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে সমিতিতে সঞ্চিত টাকা আটকে থাকায় বর্তমানে চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতেও পরিবারটিকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আবু সাঈদের অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরতের জন্য তিনি পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এর সভাপতি পার কুমিরা এলাকার মৃত ডাঃ আবুল হোসেনের ছেলে আ’লীগ নেতা মোজাফফর হোসেন লাভলুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর পক্ষ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। অসুস্থ একজন সাবেক হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও চাকরির জামানতের টাকা ফেরত নিয়ে এমন টালবাহানার অভিযোগে স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সমিতির মতো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের সঞ্চয় নিরাপদ থাকা এবং মেয়াদ পূর্তির পর নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মেয়াদি সঞ্চয়, বীমা ও জামানতের টাকা যদি মেয়াদপূর্তির পরও ফেরত দেওয়া না হয়, তাহলে সেই অর্থ বর্তমানে কোথায় রয়েছে? সমিতির আর্থিক লেনদেন, আমানত ও দায়-দেনার হিসাব কতটা স্বচ্ছ এ নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে একজন সাবেক কর্মকর্তার নিজের, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা একাধিক হিসাবের বিপরীতে প্রায় ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৫৮ টাকা পাওনা থাকার পরও কেন তা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী আবু সাঈদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁর সঞ্চিত টাকাগুলো এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু নিজের কষ্টার্জিত ও সঞ্চিত টাকা ফেরত পেতে বারবার সমিতির দ্বারে ঘুরেও সমাধান না পাওয়ায় তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ ঘটনায় পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এর আর্থিক কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট হিসাব ও গ্রাহকদের পাওনা অর্থের বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে গ্রাহকের পাওনা অর্থ দ্রুত পরিশোধ, সমিতির আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ-এর সাধারণ সম্পাদক আ’লীগ নেতা মোজাফফর হোসেন লাভলু বলেন, আমাদের সঙ্গে আবু সাঈদের লেনদেন আছে। তিনি অনেক বই থেকে টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। এজন্য আবু সাঈদ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হিসাব-নিকাশে বসা সম্ভব হচ্ছে না।
তালা উপজেলা সমবায় অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, পাটকেলঘাটা বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ তারা একটা প্রজেক্টে লস খেয়ে ধরার ভিতরে আছে। আপনি সম্ভব হলে আমার বরাবর একটা অভিযোগ দিতে বলেন ভুক্তভোগীদের। আমি ব্যবস্থা নেব।