সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী সীমান্তবর্তী এলাকায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত গাজী শাহ আলমের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার পাশাপাশি নারী কেলেংকারীতেও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তার বহুমুখী অপরাধ কর্মকাণ্ডে এলাকায় চরম উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আলম দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ও অশালীন কথোপকথনে লিপ্ত থাকতে শোনা যায়। প্রায় ৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ওই কথোপকথন ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত নারীসঙ্গ ও অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকেন।
এদিকে বহিষ্কারের পরও থামছে না তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের তৎপরতা। সীমান্তে স্থলপথে নজরদারি বাড়ায় বর্তমানে কালিন্দী নদীপথকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তার চোরাচালান নেটওয়ার্ক। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ঘাট থেকে ফেন্সিডিল, মদ, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য এবং আগ্নেয়াস্ত্র রাতের আঁধারে নৌকা বা সাঁতারের মাধ্যমে দেশে এনে কৈখালীর বিভিন্ন ঘাট দিয়ে প্রবেশ করানো হয়। পরে এসব অবৈধ পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব অস্ত্র ব্যবহার করে এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ রাতে কালিগঞ্জ সেনা ক্যাম্প ও ১৭ বিজিবির যৌথ অভিযানে শাহ আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাবিবুর রহমান অস্ত্রসহ আটক হন।
তার বাড়ি থেকে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও পাইপ উদ্ধার করা হয় এবং পরে তাকে শ্যামনগর থানায় সোপর্দ করা হয়। এছাড়া, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শ্যামনগর থানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনাতেও শাহ আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, তার নির্দেশে একটি সশস্ত্র দল থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করে এবং সেগুলো গোপনে সরিয়ে ফেলে। একই দিনে পরানপুর বাজারে তিনটি দোকানে কোটি টাকার মালামাল লুটের ঘটনাতেও তার সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যবসায়ী কওছার আলীকে মারধর ও টাকা ছিনতাইয়ের মতো একাধিক ঘটনা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধামাচাপা পড়ে গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও সুবিধাবাদী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহ আলমের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।
যদিও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাকে সাতক্ষীরা জেলা জাসাসের কমিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়, তবুও তার অপরাধ তৎপরতা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শাহ আলম। এদিকে সচেতন মহল, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শাহ আলম ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র ও মাদকের বিস্তার আরও বাড়বে, যা বিশেষ করে যুবসমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সেকারণে দ্রুত অভিযুক্ত শাহ আলমকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন, স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা।
এদিকে নারী কেলেংকারীর ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শাহ আলম প্রতিবেদকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।