সামেক হাসপাতালে ভয়াবহ কমিশন বাণিজ্য; লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত প্যাথলজি বিভাগ!
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
/ ৪০৮
Time View
Update :
রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
Share
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর এসব অভিযোগ সামনে এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। তবে এবার সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (সামেক)-এর প্যাথলজি বিভাগকে ঘিরে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক কমিশন বাণিজ্যের চিত্র, যা শুধু অনৈতিকই নয় রোগীদের জীবন নিয়েও ভয়ঙ্কর ছিনিমিনি খেলার সামিল।
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্যের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামেক হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে চিকিৎসকদের দেওয়া বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে আসা রোগীদের নিয়মিতভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অধিকাংশ সময় রোগীদের বলা হচ্ছে মেশিন নষ্ট, কেমিক্যাল সংকট, জনবল নেই কিংবা “এই টেস্ট এখানে হবে না”। অথচ এসব অজুহাতের আড়ালে চলছে সুপরিকল্পিত রোগী বাণিজ্য।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাব ইনচার্জ সুব্রত কুমার দাস একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোগীদের শহরের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে টেস্টের অর্থের অন্তত ৫০ শতাংশ কমিশন সরাসরি তার পকেটে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট এটেনডেন্ট ও দালাল চক্রকেও দিতে হচ্ছে আরও প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন। ফলে মোট কমিশনের বোঝা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো এই অস্বাভাবিক কমিশন পরিশোধ করতে গিয়ে কিছু অসাধু ডায়াগনস্টিক সেন্টার আদৌ কোনো পরীক্ষা না করেই রোগীদের হাতে মনগড়া রিপোর্ট তুলে দিচ্ছে। এতে একদিকে রোগীরা আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুল চিকিৎসা নিয়ে জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সামেক হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীদের এক ধরনের বিভ্রান্তিকর চক্রের মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক, ল্যাব ইনচার্জ, দালাল ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সাধারণ রোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। দিনশেষে পকেট ফাঁকা হলেও রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না অধিকাংশ মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে নৈতিকতা ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়। কিন্তু সেখানে যদি কমিশনই হয়ে ওঠে মূল চালিকাশক্তি, তাহলে পুরো স্বাস্থ্যখাতই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। কারণ, যেখানে কমিশনের হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ, সেখানে কোনোভাবেই মানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অজানা নয় বলেই অভিযোগ উঠেছে। বরং অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ কমিশনের লোভে অনেকেই নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই সিন্ডিকেট।
এদিকে, অতিরিক্ত কমিশনের চাপ সহ্য করতে না পেরে শহরের অনেক মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, বিপুল অঙ্কের কমিশন দিয়ে সঠিক মান বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব। এতে স্বাস্থ্যসেবার পুরো ব্যবস্থাই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
স্বাস্থ্যখাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এ ধরনের ভয়াবহ দুর্নীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সরকারি হাসপাতালে যদি রোগীদের জিম্মি করে কমিশন বাণিজ্য চালানো হয়, তাহলে তা শুধু দায়িত্বে অবহেলাই নয় এটি মানবতার বিরুদ্ধেও অপরাধ।
অবিলম্বে এই কমিশন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। রোগীদের জীবন নিয়ে এই নির্মম প্রতারণা বন্ধে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্যাথলজি ইনচার্জ সুব্রত কুমার দাসের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
সামেক হসপিটালের পরিচালক ডাঃ শেখ কুদরতি খোদার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সরকারি হসপিটাল জনগণের সেবা দেওয়ার কেন্দ্র। এখানে কোন অবস্থাতে অসাধু কাজ করার সুযোগ নেই। আপনি আমাকে অভিযোগ দেন তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।