সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আজ, ২০ নভেম্বর ২০২৫, এক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও আবেগঘন পরিবেশে বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হলো বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত দুই গুণী শিক্ষক,সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবু শশাঙ্ক কুমার রায় এবং করোনাকালীন বিদায়ী প্রধান শিক্ষক রণজিত কুমার ঘোষের। জীবনের ৩০টি বছর এই প্রতিষ্ঠানের সেবায় নিয়োজিত থাকার পর তাঁরা শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত বিদায়:
অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসা নিবেদন করেন। বিদায়ী শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট, ফুলের শুভেচ্ছা, সম্মাননা মানপত্র এবং জীবনের শেষ সময়ের পাথেয় হিসেবে একগুচ্ছ মননশীল উপহার। এই উপহার সামগ্রীর মধ্যে ছিল ধর্মীয় গ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, সেই সাথে আগামী দিনের পথচলার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন: লাইট, ছাতা, কলম, ডায়েরী ও উষ্ণ চাদর, যা এই দিনের ছোট্ট অভিবাদনকে তাঁদের আগামী দিনগুলোতে স্মৃতির উষ্ণতা যোগাবে।
প্রবীণ শিক্ষাগুরুর প্রেরণা:
অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমান। ৮৬ বছর বয়সেও তিনি বার্ধক্যকে তুচ্ছ করে তাঁর বক্তৃতায় সঞ্চার করেন প্রাণের স্পন্দন। ফুলঝুরির মতো ঝরে পড়া তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে চেষ্টার অসাধ্য সাধন করার গল্প। তিনি তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠাকালীন ১৯৬৮ সালের শিক্ষাপরিবেশ এবং সেই সময়কার কঠিন পরিস্থিতি। শামসুর রহমান স্যার ছিলেন অত্র অঞ্চলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি। বক্তৃতায় তিনি জানান, বড় বড় সুযোগ ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এই শিক্ষাবৃত্তিকে, স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। তাঁরি হাতে গড়া দুই কৃতী ছাত্রশশাঙ্ক কুমার রায় ও রণজিত কুমার ঘোষ—আজ তাঁর কাছ থেকেই শিক্ষকতা জীবনের শেষ সম্মান গ্রহণ করলেন, যা এক বিরল মুহূর্তের সৃষ্টি করে।
বক্তৃতায় আবেগ আর উপলব্ধির সুর:
সিনিয়র শিক্ষক সনদ কুমার, শাহরিয়ার স্যার সহ অন্যান্য শিক্ষকের উপস্থিতিতে এবং শ্যামল কুমার মন্ডলের মনোজ্ঞ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। দুই গুণী শিক্ষকের বিদায়কালীন মানপত্র পাঠ করেন যথাক্রমে সৌমিত্র কুমার মন্ডল ও মিজানুর রহমান চন্দন স্যার। ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করেন শেখ আরিফুজ্জামান রাজু ও শাহরিয়ার স্যার।
প্রধান শিক্ষক জনাব ফারুক হাসান তাঁর বক্তৃতায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁদের আগামী দিনগুলোর শুভ কামনা করে বলেন, “বিদায় শুধু বিদায় নয়, এর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষা আছে—নতুনভাবে পথ চলার অনুপ্রেরণা আছে।” তাঁর ক্রন্দন-মিশ্রিত কণ্ঠস্বর জীবনের এক কঠিন সত্যকে তুলে ধরে।
সদ্য বিদায়ী রণজিত কুমার ঘোষ স্যার তাঁর বক্তৃতায় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “শিক্ষার কোনো তুলনা নেই।” তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “করোনাকালে কিছুটা পিছিয়ে গেলেও এখন দেশে শিক্ষার অঙ্গন আবার সজীব হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আর স্কুল ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই, নিজেদের চেতনা দিয়ে আবার পড়ালেখায় ফিরতে হবে।”
শশাঙ্ক স্যারের শেষ স্বাক্ষর ও নীরব অশ্রু:
সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবু শশাঙ্ক কুমার রায় যখন তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শেষ স্বাক্ষরটি করলেন, তখন তাঁর দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল আবেগঘন শব্দের শব্দহীন অশ্রু। এই নীরব অশ্রুর সাথে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও নিজেদের কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
শশাঙ্ক স্যার তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “যে পথ দিয়ে আমি ৩০টি বছর ধরে হেঁটে এসেছি, আজ থেকে সে পথ বন্ধ।” প্রতিটি শব্দ যখন তিনি উচ্চারণ করছিলেন, পুরো পরিবেশটি যেন এক শীতল নীরবতায় ঢেকে গিয়েছিল।
তাঁর হাতে গড়া বহু শিক্ষার্থী আজ সমাজের অনেক বড় জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। নিজের কার্যক্রমে তিনি উচ্চাভিলাষী না হলেও ছিলেন উচ্চ চিন্তার অধিকারী। বিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম প্রবেশ করতেন এবং সবার শেষে বের হতেন। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি দেয়াল ছিল তাঁর মুখস্থ। স্বভাবে তিনি যেমন ছিলেন অত্যন্ত কোমল, তেমনি ভুল আচরণে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। কোমলতা আর কঠোরতার এই অনন্য অধিকারী মানুষটি আর কখনো বিদ্যালয়ে কঠোরতা নিয়ে হাজির হবেন না,এই ভাবনা শিক্ষার্থীদের মনে গভীর দাগ কাটে। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকের আগামী দিনগুলো আরও ভালো কাটুক এই প্রত্যাশা জানিয়ে কুশল বিনিময় করে এবং আবেগঘন বক্তৃতায় তাঁকে সম্মান জানায়।