চাকরি জীবনের সাড়ে ৩ বছরের অধিকাংশ সময় নানা অযুহাতে ছুটি আর অনুপস্থিত থেকে বেতন উঠিয়েছেন ষোল আনা। এমনটি আভিযোগ উঠেছে আশাশুনির গুনাকরকাটি শাহ্ মোহাম্মদ ইয়াহিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞানের শিক্ষিকা হাসনা হেনার বিরুদ্ধে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে সমালোচনার ঝড় বইতে দেখা গেছে। অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে সরেজমিন স্কুলে গেলে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ছাফিউল্লাহ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, যোগদানের পর থেকে মাতৃত্বকালীন ৬ মাসের ছুটি ও চাকরিতে যোগদানের পূর্বে ভর্তি হওয়া ডিএড এ আধ্যায়ন কালিন ছুটি ছাড়া বাকি দিন গুলি বিভিন্ন অযুহাতে অনুপস্থিত থেকেছেন শিক্ষিকা হাসনা হেনা। অনুপস্থিত থাকাকালিন সময়ে হাজিরা খাতায় তাকে স্বাক্ষর করতে দেয়া হয়নি। কিন্তু গত ২ মাস ছাড়া বাকি মাস গুলোর বেতন তাকে দেয়া হয়েছে। অনুপস্থিত থাকার পরেও বেতন দেয়াটা ভুল হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিভিন্ন সময় তিনি অসুস্থতার অযুহাত দেখালে তাকে বলা হয়েছে ‘আপনি অসুস্থ থাকলে প্রতিষ্ঠানের পাশ্ববর্তী এলাকায় থাকেন, সেটি আমরা মেনে নেব কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামীর কর্মস্থল ঢাকায় থাকবেন’ এটা মেনে নেয়া যায় না।
যোগদানের পর থেকে তিনি ১০০ থেকে ১১০ দিনের মত স্কুলে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, আমি ইন্টারে মানবিক বিভাগের ছাত্র হয়েও আমাকে শিক্ষার্থীদের জীব বিজ্ঞান ক্লাস নিতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের একাধিকবার মৌখিক ভাবে জানালেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্ৰহন করেননি।
প্রতিষ্ঠানে না এসেও দীর্ঘ দিন নেয়া বেতনের টাকা ফেরৎ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ কোর্টে মামলা করলে টাকা ফেরৎ দিতে তিনি বাধ্য। ২ মাস বেতন বন্ধ থাকার পর তিনি গত রবিবার ও সোমবার স্কুলে আসলেও মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার স্কুলে আসেননি। এতদিন অনুপস্থিত এবং রেজুলেশনের মাধ্যমে বেতন বন্ধ থাকার পরে পুনরায় স্কুলে আসার জন্য কোন রেজুলেশন বা কমিটির সভাপতিকে জানানোর প্রয়োজন আছে কিনা এধরনের প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, তিনি তো চাকরি ছাড়েন নি।
স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা অধিকাংশই হাসনা হেনা ম্যাডামকে চিনেন না। তথ্য অনুসন্ধানে জানাগেছে, শিক্ষিকা হাসনা হেনা ২১/১২/২০২২ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। নিয়োগ পাওয়ার পর ২২/০১/২৩ ইং থেকে পর্যায়ক্রমে ৩ ধাপে ২৫/০৬/২০২৪ ইং তারিখ পর্যন্ত বিএড অধ্যায়নকালীন সময়ের ছুটি ভোগ করলেও ছুটির আবেদন পেপারে তারিখ ছিলো ত্রুটি যুক্ত। ৩ ধাপে তিনি ছুটি কাটিয়েছেন দেড় বছর কিন্তু বিএড এ অধ্যায়নের জন্য অধ্যায়নকালীন ছুটি সর্বচ্চো ১বছর। নীতিমালা অনুযায়ী চাকরির বয়স ৫ বছর পূর্ণ না হলে বিএড এ অধ্যায়নকালীন ছুটি মঞ্জুর না হলেও তিনি সেটা অদৃশ্য শক্তির বলে অনুমোদন করিয়েছিলেন। তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিনি নিয়োগ পাওয়ার পূর্বেই বিএড শুরু করেছিলেন। এরপর ১৩/০৪/২৫ ইং থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন।
যোগদানের পর থেকে ১০০ থেকে ১১০ দিন স্কুলের হাজিরা খাতায় উনার স্বাক্ষর দেখা গেলেও বাকি লম্বা সময় ধরে তিনি নিজের ইচ্ছে মতই প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকে গেছেন। কিন্তু প্রতি মাসে বেতন ভাতা তিনি সময় মতই উত্তোলন করেছেন। সর্ব শেষ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে বেতন আটকে দেয়া হয়েছে বলে জানাগেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষিকা হাসনা হেনা বলেন, আমি দীর্ঘ দিন ধরে খুব বেশি অসুস্থ। নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার জন্য স্কুলে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের একজন শিক্ষক বলেন, স্কুলে আসা ও পাঠদানের জন্য তিনি অসুস্থ থাকলেও বিএড এব়ং সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য সামার্থ ছিলেন। শিক্ষিকা হাসনা হেনার শ্বশুরবাড়ি গুনকরকাটিতে এবং সম্পর্কে প্রধন শিক্ষকের ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী হওয়ায় দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থেকেও অফিস ম্যানেজ করে নিয়মিত বেতন উঠিয়েছেন তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার হাসানুজ্জামান বলেন, আমরা উনার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে হয়তো প্রতিষ্ঠান প্রধান বিভিন্ন অযুহাতে সত্য ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আসলে বিষয়টি যে এতদূর গড়িয়েছে সেটা আমাদের জানা ছিল না।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এডহক কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুণ্ড বলেন, এত দিন প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার কারন উনাকে জানাতে হবে। অনুপস্থিত থাকার পরেও বেতন উত্তোলনের বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা হবে। উনার বেতন বন্ধই থাকবে। বিষয়টি সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করছি। তদন্ত পূর্বক পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর কবীর এর ব্যবহৃত ০১৭১৬ ৭০২২৭৫ নাম্বারে শনিবার বেলা ২:০৯ এবং ২:২৫ মিনিট এ কল দিলে তিনি রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।