রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৬ পূর্বাহ্ন
Notice :
দৈনিক সাতক্ষীরার তথ্য

কাগজে-কলমে কোটি টাকা, ল্যাবে খালি ড্রাম!

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ২৬৯ Time View
Update : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অটোমোবাইল ল্যাবে সরকারি জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়ম, হিসাবের গরমিল এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ল্যাবের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ জ্বালানির হিসাব নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি অটোমোবাইল ও ফার্ম মেশিনারি ল্যাবের জন্য কেনা ১ হাজার ৩১০ কেজি অ্যাঙ্গেল বারের প্রকৃত ব্যবহার নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। অভিযোগ রয়েছে, অটোমোবাইল ল্যাবে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার লিটার জ্বালানি আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টরা তড়িঘড়ি করে নতুন করে জ্বালানি কেনেন বলে অভিযোগ। তাদের পক্ষ থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ লিটারের বেশি জ্বালানি কেনার দাবি করা হলেও পরবর্তীতে আরও প্রায় ৪০০ লিটার জ্বালানি গোপনে ল্যাবে ঢোকানোর সময় শিক্ষার্থী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের হাতে আটকের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে সরেজমিনে অটোমোবাইল ল্যাবে উল্লেখযোগ্য কোনো জ্বালানি মজুত পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ হিসাবপত্রে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লিটার করে জ্বালানি খরচ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি ও ল্যাবের বাস্তব চিত্রের মধ্যে এমন বড় ধরনের অসঙ্গতি কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, ল্যাবে বর্তমানে মাত্র দুটি ইঞ্জিন ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকলে এবং বাকি ইঞ্জিনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকলে প্রতিদিন ২০-২৫ লিটার জ্বালানি খরচ দেখানো কতটা যৌক্তিক? একটি ল্যাবে প্রকৃত ব্যবহার ও কাগজে-কলমে দেখানো খরচের মধ্যে এমন পার্থক্য থাকলে তার নিরপেক্ষ হিসাব নিরীক্ষা ও তদন্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, অটোমোবাইল ল্যাবের জ্বালানি মেসার্স এস খাদিজা ট্রেডার্সের মাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্রে কেনার কথা থাকলেও সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির, রসায়ন বিভাগের ইন্সট্রাক্টর দীনবন্ধু মণ্ডল এবং জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে ল্যাবের জ্বালানি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সময়ে ল্যাবের জ্বালানি নিয়ে নিজের মোটরসাইকেলে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকারি অর্থে কেনা জ্বালানি যদি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না? শুধু জ্বালানি নয়, একই প্রতিষ্ঠানের অটোমোবাইল ল্যাব ও ফার্ম মেশিনারি ল্যাবের জন্য ১ হাজার ৩১০ কেজি অ্যাঙ্গেল বার কেনা ও ব্যবহারের হিসাব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজপত্রে ৩ মিলি ওজনের অ্যাঙ্গেল বার ৩১০ কেজি, ৪ মিলি ৪৪০ কেজি এবং ৫ মিলি ৪৬০ কেজি দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ইনডেন্টে ১ হাজার ৩১০ কেজি অ্যাঙ্গেল বারের হিসাব দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে সাইকেল গ্যারেজের ছাদে ব্যবহৃত অ্যাঙ্গেল বারের পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রায় ৬০০ কেজির বেশি নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অ্যাঙ্গেল বার কেনার হিসাব দেখিয়ে বাস্তবে কম পরিমাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়ে থাকলে অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত মালামাল কোথায় গেল তারও কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। ফলে পুরো বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। সাইকেল গ্যারেজের নির্মাণকাজ নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, গ্যারেজের ছাদে ব্যবহৃত টিন ইতোমধ্যে ছিঁড়ে গেছে। একই সঙ্গে ছাদের বিভিন্ন পিলারে প্রয়োজনীয় গ্রেডের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে গ্যারেজটির কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্মাণকাজে নিম্নমানের বা অপর্যাপ্ত উপকরণ ব্যবহার হয়ে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিয়মিত চলাচল করেন এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে অ্যাঙ্গেল বার ও নির্মাণকাজের হিসাবেও লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির, রসায়ন বিভাগের ইন্সট্রাক্টর দীনবন্ধু মণ্ডল এবং অটোমোবাইল ল্যাবের জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে।

এরই মধ্যে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে আরও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জুন মাসের শেষ দিকে দুর্নীতির অভিযোগ, সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে অসদাচরণের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কের পর তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালকের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বরিশাল সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বদলি নেন। এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকারি সম্পদ ও অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শাস্তি যদি কেবল অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়, তাহলে সরকারি সম্পদের সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে? অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানের তিনজন জনপ্রিয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো গুরুতর অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের বিভিন্ন সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শাস্তিমূলকভাবে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রেও বৈষম্য ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অটোমোবাইল ল্যাবের জ্বালানি, অ্যাঙ্গেল বার, সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে জ্বালানি ক্রয়ের দরপত্র, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের চালান, স্টক রেজিস্টার, ইস্যু রেজিস্টার, দৈনিক ব্যবহার বিবরণী এবং ল্যাবের ইঞ্জিনগুলোর কার্যক্ষমতা যাচাই করার দাবি উঠেছে।

স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো কাগজপত্রের হিসাবের সঙ্গে সরেজমিন মজুত ও ব্যবহার মিলিয়ে দেখা। একইভাবে ১ হাজার ৩১০ কেজি অ্যাঙ্গেল বারের ক্রয়, সরবরাহ ও ব্যবহার পুনরায় পরিমাপ করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এবিষয়ে অভিযুক্ত অটোমোবাইল ল্যাবের জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়াজ মাহমুদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আপনি এই বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। বলে তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের ইন্সট্রাক্টর দীনবন্ধু মণ্ডল বলেন, দুর্নীতি যা হয়েছে সবই হুমায়ুন করেছেন। দয়া করে আমাকে আর এর ভিতর জড়িয়েন না।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন বলেন, আমি যোগদানের পূর্বে যা হয়েছে এ বিষয়ে কোন কিছু বলতে পারব না।

add-nolta

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By ThemesDealer.Com