সাতক্ষীরায় ‘সাগর ব্যাচ’ পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির বিস্ফোরক অভিযোগ

সাতক্ষীরা শহরে ভ্রাম্যমান ভিত্তিতে পরিচালিত “সাগর ব্যাচ” নামের একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালক মোঃ সাগর আলীর বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শহরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, মোঃ সাগর আলী ময়মনসিংহ সদর এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে সাতক্ষীরায় কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের অনিয়মিত শিক্ষার্থী। শহরের রাজারবাগান কলেজ রোড এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের নিচতলা ভাড়া নিয়ে তিনি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে রঙিন ফেস্টুন, লিফলেট ও প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হতো। বিশেষ করে দরিদ্র, মেধাবী ও এতিম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি করানো হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার পর কিছু ছাত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট করা হতো। এক শিক্ষার্থী, যার নাম পরিচয় গোপন রাখতে “বৃষ্টি” ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে, অভিযোগ করেন তাকে কোচিং সেন্টারের ভেতরে জোরপূর্বক আটকে রেখে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়।

অন্যদিকে আরেক শিক্ষার্থী “জবা” (ছদ্মনাম) অভিযোগ করেন, খুলনায় পরীক্ষার কথা বলে নিয়ে গিয়ে একটি আবাসিক হোটেলে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনার বাইরে আরও একাধিক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে আছে এবং অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা ও ভয় থেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, অভিযুক্ত সাগর আলীর আচরণ ছিল অস্বাভাবিক ও ভয়ঙ্কর। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নানা কৌশলে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতেন।

এ ঘটনায় সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। অভিভাবকদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললেও দীর্ঘদিন প্রশাসনের নজরদারির অভাব ছিল।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোঃ সাগর আলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, অভিযোগগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলোর ওপর প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধান (মেডিসিন) প্রফেসর ডা. কাজী আরিফ আহমেদ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি যদি অনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো বিষয় দেখলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা হলো নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যম। সেখানে ভয়, হয়রানি বা নির্যাতনের কোনো স্থান নেই। প্রশাসন, অভিভাবক ও সচেতন সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোঃ আশরাফুল আলম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোচিং সেন্টারের আড়ালে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ পেলে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ভয় না পেয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানাই। কোনো অপরাধী যেন সামাজিক প্রভাব বা ভয়ভীতি দেখিয়ে পার পেয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সচেতন নাগরিক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করাই বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *